সেলিম মাহবুবঃ
আজ রোববার ( ১১ জানুয়ারি ') এ ভূখণ্ডের এক কিংবদন্তিকে— স্বরণীয় করেছে তাহার পরিবার।
একজন ন্যায়নিষ্ঠ, আপসহীন এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিচারপতিকে। যাঁর নাম স্বাধীনতার পূর্ব ইতিহাসে যেমন উজ্জ্বল, স্বাধীনতার পরেও দেশের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের অগ্রযাত্রায় চিরস্মরণীয়—তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ। তাঁর ১১৫তম জন্মবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে।
আইনের ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র
বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম কিংবদন্তি আইনবিদ। তিনি শুধু আদালতের বিচারকই নন—তিনি ছিলেন আইনের শাসনের প্রবক্তা, মানবাধিকার রক্ষার প্রতীক এবং সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের নির্ভীক কণ্ঠ।
১৯৬৪ সালে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি নিন্ম আদালতের উন্নয়ন, বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশাল ভূমিকা রাখেন। তাঁর রায়, পর্যবেক্ষণ এবং বিচারিক দর্শন শুধু পাকিস্তানেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়।
সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ইতিহাসে এটি ছিল ন্যায়বিচারের পক্ষে এক ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব প্রতিবাদ—যা আজও আইনের ছাত্রদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
উচ্চশিক্ষা, মেধা ও ব্যারিস্টারি ডিগ্রি
১৯১১ সালের ১১ জানুয়ারি কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ। তাঁর বাবা সৈয়দ আবদুস সালেক ছিলেন বঙ্গীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা। জাতীয় নেতৃবৃন্দের পরিবারে তাঁর শৈশব ও কৈশোর গড়ে ওঠে নিয়মতান্ত্রিক ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ছিলেন তাঁর মামা।
১১৫তম জন্মবার্ষিকীর কর্মসূচি
এ উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাঁর স্মরণে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এদিকে সকাল সাড়ে দশটায়-বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন ও কবর জিয়ারত এবং কোরআন তেলাওয়াত সহ দোয়া মোনাজাত করা হয়েছে।
এ সময়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ, ড.সৈয়দ মাখদুন মাহবুব, বাংলা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন এর সভাপতি মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার, জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো.মঞ্জুর হোসেন ঈসা, রফিকুল ইসলাম মন্টু সহ প্রমুখ।
১৯২৬: বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকে রাজশাহী বিভাগে প্রথম
১৯৩০: প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা থেকে অর্থনীতিতে অনার্স
১৯৩২: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ
১৯৩৩: প্রথম শ্রেণিতে আইন পরীক্ষা উত্তীর্ণ
১৯৩৯: যুক্তরাজ্যের দ্য অনারেবল সোসাইটি অব লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি এই অসাধারণ শিক্ষাগত অর্জন তাঁর ভবিষ্যৎ কর্ম জীবনে প্রজ্ঞা ও দক্ষতার অমূল্য ভিত্তি তৈরি করে। কর্মজীবনের বিস্তার ও সাফল্য
১৯৫৪: ঢাকা হাইকোর্টে যোগদান
১৯৫৪: হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত
১৯৬২–১৯৬৩: পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট
কোর্টের বিচারক
১৯৬৪: পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান
বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন এমন এক বিচারক যিনি আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গভীর দর্শন ও মানবতার দৃষ্টিকোণকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁর দেয়া বেশ কিছু রায় আজও আইনশাস্ত্রে ‘ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট’ হিসেবে গণ্য হয়।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা তিনি আইন ছাড়াও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চিন্তাধারায় ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী।
বাংলা-ইংরেজি ছাড়াও বহু ভাষায় তাঁর দখল ছিল। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল ইসলামী চিন্তাবিদ ও গণতন্ত্রের অকুতোভয় সমর্থক।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, যা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশাল সাহসিকতার পরিচয়।
জাতির ক্রান্তিকালে দৃপ্ত ভূমিকা
পাকিস্তানের দমন-পীড়নমূলক শাসন, আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সময় তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে নিরলস ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রভাব আইনজীবী, রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবী সমাজকে নতুন দিশা দেখায়।
শেষ জীবন ও প্রয়াণ
বিচারপতি মোর্শেদ ১৯৭৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তিনি মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ন্যায়বিচারের দর্শন আজও জীবন্ত।