নিজস্ব প্রতিবেদক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র অভাবনীয় পরাজয় ও রাজনৈতিক ‘ভরাডুবি’ নিয়ে সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির অন্যতম প্রয়াত নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহর পুত্র রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়লেও, ভোটের ফলাফলে তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে।
দৈনিক বাংলা প্রতিদিনের এক বিশেষ অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—ভোটের মাঠের এই পরাজয় আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়, বরং বিগত কয়েক মাসের পুঞ্জীভূত জনরোষ এবং দলীয় অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চরম ‘অতি-আত্মবিশ্বাস’ তৈরি হয়েছিল। প্রার্থীসহ কর্মীরা ধরে নিয়েছিলেন যে মাঠে তাদের কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ নেই। এই ধারণা থেকে তারা সাধারণ ভোটার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে দূরত্ব তৈরি করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে কাপাসিয়ায় বিএনপির নাম ভাঙিয়ে একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল: সাধারণ মানুষের জমি দখল, মাটি কাটা এবং গজারী বন উজাড় করার মতো পরিবেশবিরোধী ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন এক শ্রেণির নেতাকর্মী। টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয় দেওয়া এবং আলোচিত ধর্ষণ মামলার আসামিদের সাথে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো ছিল সাধারণ মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য। বিচার সালিশের নামে অর্থ গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের নামে মামলা দিয়ে হয়রানি করার ‘বাণিজ্য’ ভোটারদের বিএনপির প্রতি বিমুখ করেছে। প্রয়াত নেতা হান্নান শাহর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও সিনিয়র নেতাদের সাইডলাইন করে দেওয়া এবং ৫ আগস্টের আগের রাজপথের ‘ত্যাগী’ কর্মীদের বদলে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘সুবিধাবাদীদের’ প্রাধান্য দেওয়া ছিল রিয়াজুল হান্নানের বড় ভুল। মুষ্টিমেয় কিছু নেতাকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থ উপার্জনের একচেটিয়া সুযোগ করে দেওয়ায় দলের ভেতরেই অন্তঃকোন্দল চরমে পৌঁছায়। স্থানীয় সাংবাদিকদের অবমূল্যায়ন এবং ভোটারদের কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদানের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। এই হুমকি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভীতি ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ধারণা জন্মেছিল যে বিএনপি প্রার্থী জয়ী হলে চাঁদাবাজি নির্যাতন ও দখলবাজি আরও বাড়বে। এই ভীতি থেকে আওয়ামী লীগের একটি অংশ নিরব সমর্থন দেয় এবং সাধারণ ভোটাররা নিরাপদ মনে করে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী সালাউদ্দিন আইউবীকে বেছে নেয়। শেষ পর্যন্ত বিএনপির এই ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কাপাসিয়ায় দলটির এমন পরাজয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—নেতৃত্বের দাম্ভিকতা এবং তৃণমূলের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে না পারারই করুণ পরিণতি।