সেলিম মাহবুবঃ
ছাতকে আজ চোখে-ঘুষি মারা বাস্তবতা-পানি নেই, নেই নলকূপে শব্দ, নেই খালের স্রোত, নেই নদীর গতি। চারদিকে শুধু শুকনো মাটি, পুড়ে যাওয়া জমি আর তৃষ্ণায় মানুষের হাহাকার।এমন পানি সংকট ছাতকের মানুষ কখনো দেখেনি। এক লক্ষ-লক্ষ মানুষ আজ খাবার পানির সংকটে। অথচ সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।
উপজেলার অধিকাংশ গ্রামের কোথাও পানি নেই ১৩ টি ইউনিয়নের সকল গ্রামই বলতে গেলে পানিশূন্য। নলকূপ, পুকুর, খাল, হাওর, নদী সব উৎসই আজ শুকিয়ে ধুলো উড়ছে।
বৃষ্টিহীন দীর্ঘ তাপদাহে মাটির নিচে পানির স্তর ২০০-৩০০ ফুট নিচে নেমে গেছে, ফলে উপজেলার ১৮ হাজার নলকূপের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার নলকূপে পানি ওঠে না।
এ ছাড়া গ্রামে কিছু-কিছু গভীর নলকুপ থাকায় (যাতাকল) নলকুপগুলো পানি শুন্যতায় পড়েছে। সরকারি দপ্তরের হিসেব ও এমনি। যাতা কলে পানি নেই। বর্ষায় এগুলো কাজ করে, হেমন্তে নেই।
গ্রামের দৃশ্য হচ্ছে শিশুরা মাথায় কলস, নারীরা কাঁধে বালতি, বৃদ্ধরা লাঠি ঠেকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে পানি আনছেন। বালতি-কলস হাতে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
খাবার পানির জন্য এবাড়ি-সেবাড়ি ঘুরতে হচ্ছে মানুষকে। আর পানির অভাবে দূষিত পানি পান করে অনেকেই ডায়রিয়া, জ্বর ও চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
মৃতপ্রায় নদী, মরাখাল, পুকুর ভরাট জলাশয় ভরাট হয়েছে। কাজেই পর্যাপ্ত পানির কোন ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ গ্রামের খোলা প্রান্তরে বসানোর বদলে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন আঙিনায় গভীর নলকূপ বসানো হয়।
যা একটি পরিবারের কাজে আসছে।অভাবী পরিবারগুলো সরকারি গভীর নলকুপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারছেনা। যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা পানি দিতেও অনীহা প্রকাশ করছে।
একাধিক গ্রামবাসীদের ভাষায়, জনস্বাস্থ্য বিভাগ নলকূপ দিয়েছে বিগত সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের নামে। এসব গরীবের নলকুপ কোটিপতিদের ঘরে। তাতে পানিও আসে না, আবার গ্রামের মানুষের কোনো উপকারও হয় না।”
জাউয়াবাজার এলাকার মুলতানপুর গ্রামের ক্বারী মাওলানা জুনায়েদ আহমদ বলেন ১৫ বছর আগে যা ৫০০ ফুটে পানি দিত, এখন ৭০০ ফুটেও পানি আসে না। দিনে ১০-১২ বার চাপ দিলেও এক ফোঁটা পানি ওঠে না।
ব্যবসায়ি সামছুল ইসলাম জানান-এ বছর পরিস্থিতি চরম। গ্রামের প্রায় সব টিউবওয়েল মরা। হাতে ব্যথা হয়ে গেলে ও পানি উঠে না।”
উত্তর খুরমা ইউপির গিলাছড়া গ্রামের গাড়ি চালক আরজদ আলীর কণ্ঠে অসহায়তা-অবস্থা এমন যে পুকুরের নোংরা পানি গরম করে খেয়ে বাঁচতে হচ্ছে। গদার মহল গ্রানের চমক আলী বলেন, গ্রামের মধ্যে কোন পুকুর ও নেই।
যার বাড়িতে গভীর নলকুপ আছে তারা বাড়ি থেকে পানি আনতে দেয়না। পুরো গ্রামটা জুড়েই পানির জন্য হাহাকার চলছে।
স্কুল-কলেজেও পানির হাহাকার। এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানিক মিয়া বলেন মাসখানেক ধরে কোনো টিউবওয়েলে পানি পাই না। বাচ্চারা স্কুলে এসে তৃষ্ণায় অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমরা বাধ্য হয়ে খাল-পুকুরের পানি ফুটিয়ে পান করছি।
এক শিক্ষক যোগ করেন-এ বছরের মতো এমন পানিসংকট ছাতকে আর কোনো দিন দেখিনি। পানি না থাকলে চলাও যায় না, পড়াশোনাও চলে না।”
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE)–এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ ইছহাক আলী এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সরকারি গভীর নলকূপ স্থাপন কাজ চলামান রয়েছে। হাতে চাপা নলকূপে বছরে শীতের তিনমাস পানি উঠছে না-কারণ ভূগর্ভস্থ পানির স্থর “স্বাভাবিক মাত্রার নিচে” নেমে গেছে। তার ভাষায়-যেখানে আগে ৪০০ ফুটে পানি পাওয়া যেত, সেখানে এখন ৭০০ ফুটেও নিশ্চিত নয়। প্রতিদিনই মানুষ ফোন করে জানাচ্ছেন-টিউবওয়েল পানি দিচ্ছে না।
এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ ডিপ্লোম্যাসি চাকমা বলেন, ছাতকে পানির সংকট সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।