মোহাম্মদ মাসুদ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড জঙ্গলসলিমপুরে র্যাব সদর দপ্তর হেডকোয়ার্টার টিম সহ র্যাব-৭, র্যাব-৯, যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার। অপরাধীদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্ত্রাসীদের পতন ও দমনে সাধারণ নিরীহ মানুষের মাঝে ফিরছে স্বস্তি।
০৯ মার্চ (সোমবার) ভোর সাড়ে ৫টায়, যৌথবাহিনীর
বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ও ৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ র্যাবের বৃহৎ অভিযানিক অংশ নেই।
বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে র্যাবের ৪০০ জনসহ সর্বমোট ৩,১৮৩ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন। প্রবেশ ও বাহিরের পথগুলোতে বসানো হয় তল্লাশিচৌকি এবং জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী ও র্যাব এর আভিযানিক দল।

র্যাবের সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) সহকারী পুলিশ সুপার
এ. আর. এম. মোজাফ্ফর হোসেন জানান, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের নেটওয়ার্ক দুর্বল করা এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং আইন, শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম চলমান থাকবে।
তিনি আরো জানান, অভিযান চলাকালে বিভিন্ন পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে মোট ২২ জনকে আটক করা হয়। এ সময় যৌথ বাহিনী কর্তৃক ০৩টি আগ্নেয়াস্ত্র (০১টি বিদেশী পিস্তল, ০১টি দেশীয় পিস্তল ও ০১টি এলজি), ২৭টি পাইপগান, ৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ৫৭টি অস্ত্র তৈরির পাইপ, ৬১টি কার্তুজ, বিভিন্ন ধরনের ১১১৩ রাউন্ড গুলি, ১১টি ককটেল (বিস্ফোরক), পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও ১৯টি সিসি ক্যামেরা, ০৩টি ডিডিআর, ০১টি পাওয়ার বক্স এবং ০২টি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়েছে, যা অপরাধীদের নজরদারি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো।
উক্ত যৌথ অভিযানে আলীনগর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থিত সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও অস্ত্র তৈরির কারখানাসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ডের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়। পাশাপাশি আলীনগরের বিভিন্ন প্রবেশ পথ ও পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ওয়াচ টাওয়ারগুলোর কার্যক্রমও ভেঙে দেওয়া হয় কারণ এসব ওয়াচ টাওয়ার ব্যবহার করে অপরাধীরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গমনাগমন পর্যবেক্ষণ করত।

উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পাহাড়ি এই এলাকাটি বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি যৌথবাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালান। অভিযানের সময় পাহাড়ি ঝোপঝাড় ও নির্জন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ি অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্র গোপনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল। এসব অপরাধ দমনে যৌথবাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
অভিযানের পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য :গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার অভিযানকালে কতিপয় দুষ্কৃতিকারীরা র্যাব সদস্যদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় চারজন র্যাবের সদস্য গুরুত্বর রক্তাক্ত জখম প্রাপ্ত হলে অন্যান্য র্যাব সদস্যরা তাদের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সিএমএইচ-এ নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজন র্যাব সদস্যকে মৃত ঘোষণা করেন। উক্ত নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হলে ব্যাপক আলোচিত হয়। জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় তা হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের ‘নিরাপদ আস্তানা। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী।
অভিযান শেষে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ও র্যাব ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযানের ফলে স্থানীয় জনসাধারণের নিকট স্বস্তি ফিরে এসেছে। জনসাধারণ যৌথ বাহিনীর নিকট কৃতজ্ঞতা-জ্ঞাপন করেন।