হুমায়ুন কবির,রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা যেন এখন বিশ্ববাসীর নিত্যসঙ্গী। দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, বাড়তি খরচ আর সীমাহীন ভোগান্তিতে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ। ঠিক এমন এক বাস্তবতায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার এক সাধারণ মেকানিক রতন মহন্ত দেখাচ্ছেন ভিন্ন এক সম্ভাবনার দিগন্ত,যা স্বল্প খরচে, পরিবেশবান্ধব চলাচলের এক অনন্য উদাহরণ।পৌর শহরের মহলবাড়ী এলাকার সুরেন মহন্তের ছেলে রতন মহন্ত পেশায় একজন অটোভ্যান মেকানিক। একসময় সাইকেল মেরামতের কাজ দিয়ে তার যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে পৌর শহরের কলেজ রোডে রয়েছে তার নিজস্ব যন্ত্রাংশের দোকান। সীমিত সামর্থ্য আর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি তৈরি করেছেন ব্যতিক্রমধর্মী এক ব্যাটারি চালিত মোটরসাইকেল। শুক্রবার ১৭ এপ্রিল বিকালে তার সাথে কথা হলে তিনি জানান,২০১৯ সালে একটি পুরাতন ১০০ সিসি সুজুকি মোটরসাইকেল কেনার পর থেকেই নানা যান্ত্রিক সমস্যায় পড়েন রতন। বারবার মেরামত করেও পুরোপুরি সমাধান না হওয়া এবং তেলের ক্রমবর্ধমান খরচ তাকে ভাবিয়ে তোলে। অবশেষে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি নেন সাহসী সিদ্ধান্ত। ইঞ্জিন বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে বাইকটিকে রূপান্তর করা।
নিজের হাতে বাইকের ইঞ্জিন খুলে সেখানে স্থাপন করেন ১২ ভোল্টের চারটি ব্যাটারি এবং একটি অটোরিকশার শক্তিশালী মোটর। ব্যাটারি ও মোটরের সমন্বয়ে তৈরি এই বৈদ্যুতিক বাইক এখন দিব্যি ছুটে চলে। একবার চার্জে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সক্ষম এই বাইকটির বিদ্যুৎ খরচ হয় মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকায়, যেখানে একই দূরত্ব পাড়ি দিতে সাধারণ মোটরসাইকেলে জ্বালানি খরচ হয় প্রায় ৪০০ টাকা।
রতন মহন্ত বলেন,“শুরুতে অনেকেই আমাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করেছে, কেউ বিশ্বাস করেনি এটা দিয়ে ঠিকমতো চলা সম্ভব কিনা । কিন্তু আমি চেষ্টা চালিয়ে গেছি। এখন যখন তেলের জন্য মানুষ ভোগান্তিতে, তখন তারাই এখন আমার কাজের প্রশংসা করছে।”তার এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার এই ব্যাটরি চালিত বাইকটি দেখতে প্রতিদিন তার বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন অনেক বাইকচালক। কেউ কেউ চলমান জ্বালানি তেলের ধকল সহ্য করতে না পেরে তার কাছ থেকে বানিয়ে নিতে চাচ্ছেন এমন বাইক। পরিবেশ দূষণ কমানো, খরচ সাশ্রয় এবং স্থানীয় প্রযুক্তির উন্নয়নে এমন উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। রতনের প্রতিবেশী আবু হানিফ বলেন, “তেল কিনতে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অথচ রতন খুব সহজেই চলাফেরা করছেন, খরচও খুব কম। আমিও এখন নিজের বাইকটাকে ব্যাটারিতে রূপান্তরের কথা ভাবছি।”তিনি আরও জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে এই ধরনের উদ্ভাবন আরও আধুনিক ও কার্যকর রূপ পেতে পারে। রতন মহন্তের এই উদ্যোগ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে,আমরা কি এখনো প্রচলিত জ্বালানির উপর নির্ভরশীল থাকবো, নাকি বিকল্প শক্তির পথে হাঁটবো? স্থানীয় পর্যায়ের এমন উদ্ভাবনগুলো যদি সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় পর্যায়েও জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায় বড় অবদান রাখতে পারে।