হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিরায় প্রয়োগযোগ্য বিভিন্ন প্রকার স্যালাইন ও কুকুরে কামড়জনিত জরুরি ভ্যাকসিনের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেওয়ায় চিকিৎসাসেবা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণের অপ্রতুলতায় জ্বর, ডায়রিয়াসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে করে বিশেষত নিম্নআয়ের ও অসচ্ছল রোগীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতাল থেকে ন্যূনতম ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ না থাকায় প্রায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় উপকরণই বাইরে থেকে অতিরিক্ত মূল্যে সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গিয়ে অনেকের জন্য তা অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০ শয্যা বিশিষ্ট এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। অপরদিকে, ইনডোর বিভাগে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় ৯০ থেকে ১৩০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অথচ এই বিপুল সংখ্যক রোগীর বিপরীতে ওষুধ ও স্যালাইনের সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত।চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ভাষ্য, অধিকাংশ ওষুধই বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এমনকি কলেরা স্যালাইন, নরমাল স্যালাইনসহ অত্যাবশ্যকীয় উপকরণও হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে না। আখতার নামের এক রোগীর স্বজন জানান, পেটের জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর জন্য টানা দুইদিন বাইরে থেকে স্যালাইন কিনে এনে দিতে হয়েছে, কারণ হাসপাতালে কোনো স্যালাইন মজুদ ছিল না। একইভাবে মমেনা ও রশিদা আক্তার নামের দুই রোগীও জানান, ওষুধ ও স্যালাইন বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে তারা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ওয়ারিস ইয়াজদানি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে কলেরা স্যালাইন, নরমাল স্যালাইন, ডিএনএস, হার্টম্যানসহ বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনের তীব্র ঘাটতি বিরাজ করছে। পাশাপাশি কুকুর কামড়ের প্রতিষেধক ভ্যাকসিনও সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এ সংকট নিরসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৫০ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন সরবরাহ পাওয়া গেলেও রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. আবুল বাসার মোঃ সাইদুজ্জামান জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতির কারণেই এ ধরনের সংকট ঘনঘন দেখা দেয়। নতুন অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অবহিত করা হয়েছে। কুকুর কামড়ের ৩০টি ভ্যাকসিনের জন্য বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বাস্তবে প্রায় তিনগুণ বেশি রোগীকে সেবা প্রদান করা হচ্ছে, যা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী সরদার জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আবেদনপত্র পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎজনিত সমস্যা নিরসনে হাসপাতালে আইপিএস স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্যালাইনের সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অপরদিকে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পীরগঞ্জ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জাহিদুর রহমান বলেন, “স্যালাইন সংকটের বিষয়টি আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। জানানো হলে আমি তা সংসদে উত্থাপন করতাম। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করব।”
সর্বোপরি, চিকিৎসা উপকরণের এই তীব্র সংকট দ্রুত নিরসন না হলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।