হুমায়ুন কবির,রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নন; তিনি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক অমিত সাহসের নাম, মানবতার পক্ষে উচ্চকিত এক অনন্ত কণ্ঠস্বর। সাম্য, প্রেম, দ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে দীপ্ত শিখা তিনি প্রজ্বলিত করেছিলেন, তা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে চলেছে। সেই চেতনার উত্তরাধিকার তরুণদের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানালেন নবপ্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইশরাফিল শাহীন। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার গোগর আব্দুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের হলরুমে উপজেলা ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ষড়জ শিল্পী গোষ্ঠী’ আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ড.ইশরাফিল শাহীন ব

লেন,“তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও বিপ্লবী চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। কারণ নজরুল শুধু একটি নাম নন, তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবতার পক্ষে উচ্চারিত এক অনন্ত কণ্ঠস্বর।” তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক বিভাজন, হিংসা, অসহিষ্ণুতা এবং মূল্যবোধের ক্রমাবনতির প্রেক্ষাপটে নজরুলের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষাকে নতুন করে উপলব্ধি করা সময়ের দাবি। তরুণ সমাজের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নজরুলচর্চার কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অমর বার্তাবাহক জাতীয় কবির স্মৃতিকে ধারণ করে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ষড়জ শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি রেজাউল ইসলাম বাবু। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের হলরুমটি যেন রূপ নেয় এক প্রাণময় সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, কবি ও গবেষক তারেক রেজা। তিনি জাতীয় কবির সাহিত্যকর্ম, জীবনদর্শন এবং মানবমুক্তির সংগ্রামে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থান তুলে ধরে বলেন,“নজরুল ছিলেন শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে আপসহীন এক কণ্ঠসৈনিক। তাঁর সাহিত্য কেবল নান্দনিকতার চর্চা নয়; বরং তা মানুষকে জাগিয়ে তোলার শক্তি, প্রতিবাদের প্রেরণা এবং মুক্তির আহ্বান বহন করে।”বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতাউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আল্লামা আল ওয়াদুদ বিন নূর আলিফ, পৌর বিএনপির সভাপতি শাহাজাহান আলী, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি-গীতিকার, সিনিয়র সাংবাদিক ও অধ্যাপক

আনোয়ারুল ইসলাম, স্বনামধন্য ক্রীড়া সংগঠক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম, রাণীশংকৈল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মহাদেব বসাক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার বসাকসহ স্থানীয় শিক্ষাঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিদ্রোহী কবির সাম্যবাদী দর্শন, মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে। তাঁরা বলেন, বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি স্বাধীনচেতা, প্রতিবাদী এবং ন্যায়ভিত্তিক মনন গঠনে নজরুলের অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পর্ব। ষড়জ শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা পরিবেশন করেন নজরুলসংগীত, আবৃত্তি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। জাতীয় কবির সৃষ্টির প্রেম, দ্রোহ, বেদনা, সাম্য ও মানবতার অনির্বাণ বার্তায় ভরপুর প্রতিটি পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। কখনো করতালির ঢেউ, কখনো নীরব মুগ্ধতা—পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে যেন অনুভূত হয় নজরুলের সেই অমলিন উচ্চারণ, “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” চমৎকার উপস্থাপনা ও সাবলীল সঞ্চালনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত করে তোলেন এস এম ফেরদৌস বাহার ও দিলারা বেগম।