মোহাম্মদ মাসুদ
দীর্ঘ ৪২ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিতে দীর্ঘ তিন দশক ধরে জলবদ্ধতার ভয়াবহ ভোগান্তিতে চট্টগ্রামবাসী। টানা কয়েকদিনের অতি ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের জনজীবন। গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ডে নগরী ও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস, দেয়ালধস, গাছ উপড়ে পড়া এবং সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ। এরই মধ্যে পৃথক তিনটি দুর্ঘটনায় দুই শিশুসহ তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে নগরীর রহমাননগর এলাকায় প্রবল বর্ষণের সময় একটি দেয়াল ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এরপর বুধবার (৮ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে মাত্র ১০ মাস বয়সী শিশু **মো. আশরাফুল ইসলাম তানভীর** নিহত হয়। সে জঙ্গল সলিমপুর ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মহিন উদ্দিনের ছেলে। দুর্ঘটনায় একই পরিবারের আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) রাসেল জানান, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে বসতঘরের ওপর পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করলেও তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
একই দিন দুপুরে নগরীর পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকায় আরেকটি পাহাড়ধসে **সুমাইয়া আক্তার (১১)** নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা ঘর থেকে বের হতে পারলেও সুমাইয়া বের হতে পারেনি। পাহাড়ের ধসে পড়া মাটি ও ঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে সে।
বায়েজিদ বোস্তামী ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, নিহত সুমাইয়ার পরিবারের খোঁজখবর নিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে শোকসন্তপ্ত বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাদের প্রতি সমবেদনা জানান।
অন্যদিকে, নগরীর বিআরটিসি ফলমুন্ডি এলাকায় একটি বড় গাছ সড়কের ওপর ভেঙে পড়লে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান এক রিকশাচালক। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ের মাটি সড়কে নেমে আসায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।
অতি ভারী বর্ষণের কারণে নগরীর নিচু এলাকা, আবাসিক পাড়া, বাজার এবং প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। জলাবদ্ধতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক কর্মজীবনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও দেয়ালধসের মতো দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ, পাহাড় সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রতি বছরই প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়া, পাহাড় ও ঝুঁকিপূর্ণ দেয়ালের আশপাশে অবস্থান না করা এবং জরুরি প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।