হুমায়ুন কবির ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা
একটি সাজানো-গোছানো সংসার, বুকভরা আশা আর সোনালী স্বপ্নের হাতছানি—সবকিছু মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল আকাশের বুকে হানা দেওয়া এক চিলতে আগুনের ঝলকানিতে। যে জমিতে ঘাম ঝরিয়ে ফলানো হয়েছিল সোনালী আঁশ, সেই ফসলের মাঠই শেষ পর্যন্ত বাবা-ছেলের শেষ ঠিকানায় পরিণত হবে, তা কে জানত!
গত বুধবার ১৫ জুলাই দুপুরের তপ্ত রোদের পর যখন মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছিল, তখনো ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মোহাব্বতপুর গণেশপাড়া গ্রামের আকাশটা হয়তো এমন এক নির্মম ট্র্যাজেডির সাক্ষী হতে চায়নি। মাঠে তখন পরম যত্নে পাট কাটছিলেন ৫৫ বছর বয়সী বাবা আনোয়ার প্রভু (নারায়ণ) এবং তার ২৩ বছরের তরুণ ছেলে নিমাই। সঙ্গে ছিলেন আরও দুই প্রতিবেশী।
হঠাৎ করেই প্রকৃতি যেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। ঝুম বৃষ্টির সঙ্গে আকাশ চিরে নেমে এল এক বজ্রাঘাত। আর তাতেই মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল একটি পরিবারের দুটি মূল খুঁটি।ঘটনাস্থলেই ঝরে যায় ছেলে নিমাইয়ের তাজা প্রাণ। যে সন্তানকে পরম স্নেহে বড় করেছিলেন বাবা, চোখের সামনে তার এমন নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে বাবার বুকে তখন কীরূপ হাহাকার উঠেছিল, তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়। তবে সেই শোক সইবার সময়টুকুও পাননি নিয়তি-তাড়িত বাবা আনোয়ার প্রভু। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। ওপারে হয়তো একা যেতে দেওয়া যাবে না প্রাণপ্রিয় সন্তানকে—তাই তো পরম মায়ায় ছেলের হাতটি ধরে বাবাও বিদায় নিলেন এই ধরণী থেকে।
এ ঘটনায় পুরো এলাকা জুড়ে এখন নেমে এসেছে এক গভীর ও স্তব্ধ নীরবতা। স্তব্ধ হয়ে গেছে বাতাস, থমকে গেছে চেনা কোলাহল। প্রতিবেশীদের চোখে অশ্রুর বন্যা, আর স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে মোহাব্বতপুর গণেশপাড়া গ্রামের আকাশ-বাতাস। একটি বজ্রপাত কেবল দুটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, চিরতরে নিভিয়ে দিল একটি পরিবারের আশার প্রদীপ।
বজ্রপাতের এই নির্মম আঘাত আরও একবার আমাদের মনে করিয়ে দিল—প্রকৃতির এই রুদ্র রোষের সামনে আমরা কতটা অসহায়! শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা। ওপারে বাবা-ছেলে ভালো থাকুন পরম শান্তিতে।