সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল:
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিএম কলেজে নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বেতন-স্কেল সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে ৩০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকার। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তাদের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে মোট ১০ কোটি ১১ লাখ টাকারও বেশি ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকাংশের নিয়োগ বিধিসম্মত নয়। এছাড়া কয়েকজনের বিরুদ্ধে জাল সনদ, অযোগ্য শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অতিরিক্ত বেতন-স্কেল গ্রহণের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করা অর্থ ফেরতের পাশাপাশি পরবর্তীকালে গ্রহণ করা বেতন-ভাতাও ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম মোস্তফা কামাল-এর নিয়োগ বিধিসম্মত না হওয়ায় তার গ্রহণ করা ৬৪ লাখ ৯০ হাজার ৪০৮ টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আনিছুর রহমান, মো. মনজুর কাদের, প্রভাষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, নাজমুল হাসান, মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম, মো. ফরিদুল ইসলাম, মো. মোস্তফা কামাল এবং মো. শাহজাহান কবীরসহ একাধিক শিক্ষককে কয়েক লাখ থেকে ৬০ লাখ টাকার বেশি অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভোকেশনাল ও মাধ্যমিক শাখার একাধিক ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর, প্রদর্শক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র নিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মেই ২৭ জনের কাছ থেকে মোট ৯ কোটি ৪ লাখ ১ হাজার ৪৯৩ টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
নিরীক্ষায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আনিছুর রহমান দাখিল করা জাতীয় বহুভাষী সাঁটলিপি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নট্রামস), বগুড়ার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদটি জাল ও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। ফলে তার নিয়োগ অবৈধ হওয়ায় ২০০৪ সালের ১ মে থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রহণ করা ৬১ লাখ ২৭ হাজার ১৩৪ টাকা ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা সংক্রান্ত যোগ্যতা পূরণ না করেও বেতন-ভাতা ও উচ্চতর স্কেল গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. আব্দুল হক, প্রভাষক মো. শাহজাহান কবীর, সহকারী শিক্ষক শিরিনা আক্তার ও জাকিয়া সুলতানা-র বিরুদ্ধে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগে সরকারি অর্থ ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া সহকারী শিক্ষক রেখা রানী রায় অতিরিক্ত স্কেল বাবদ ২২ লাখ ৮১ হাজার ৬২৫ টাকা, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মোছা. নূর জাহান বেগম ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭৩২ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা ভ্যাট ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংরক্ষিত তহবিল ২ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকায় এবং সাধারণ তহবিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৫ টাকা থেকে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিষ্ঠানে এখনো ভবিষ্য তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড) চালু না থাকায় সব শিক্ষক-কর্মচারীর নামে দ্রুত প্রভিডেন্ট ফান্ড চালুর নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ডিআইএর এই প্রতিবেদন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, সনদ যাচাই ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।