সৈয়দ মুনিরুল হক নোবেল:
জামালপুর সদর উপজেলার ১১নং শাহবাজপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর মৌজায় ক্রয়কৃত সাড়ে ৪৫ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একটি অসহায় পরিবারকে হামলা, মামলা ও নানা ধরনের হুমকির মুখে আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বৈধ মালিকের কাছ থেকে ক্রয় করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকা জমিতে ভুলক্রমে অন্য ব্যক্তিদের নামে রেকর্ড হওয়াকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে এবং বর্তমানে চলমান মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এতে পরিবারটির সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জানমালের নিরাপত্তা চেয়ে তারা জামালপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, মির্জাপুর মৌজার সিএস খতিয়ান নং-৫৮, সিএস দাগ নং-৮৯সহ অন্যান্য দাগে মোট ৬ একর ৪১ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন চন্দ্রনা কোচ। তার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে নদীরাম শংকর এবং পরবর্তীতে নদীরাম শংকরের মৃত্যুর পর তার একমাত্র পুত্র কোটেশ্বর চন্দ্র শংকর দাশ ওই সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগদখলে ছিলেন।
পরবর্তীতে কোটেশ্বর চন্দ্র শংকর দাশ ১৯৫৬ সালের ১০ মার্চ ৪০৪৭নং সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে তার স্ত্রী বিনোদেনী দাশের কাছে সাড়ে ৪৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। দলিল অনুযায়ী, সিএস খতিয়ান নং-৮৯-এর ৭৭ শতাংশ জমির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ থেকে ওই সাড়ে ৪৫ শতাংশ জমি বিক্রি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিনোদেনী দাশ ক্রয়সূত্রে ওই জমির মালিক হয়ে দীর্ঘদিন ভোগদখলে থাকলেও পরবর্তী আরওআর রেকর্ডে তার নামে জমিটি রেকর্ডভুক্ত হয়নি। বরং ভুলক্রমে তার স্বামী কোটেশ্বর চন্দ্র শংকর দাশের নামে রেকর্ড লিপিবদ্ধ হয়।
পরবর্তীতে বিআরএস জরিপে বিনোদেনী দাশের নামে রেকর্ড হওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও তার নামে রেকর্ড না হয়ে মৃত কিশমত আলীর ওয়ারিশ আলী, মোঃ মাসুদ, মোছাঃ খালেদা বেগম, মোছাঃ মমতা বেগম, মোছাঃ কলি বেগম, মোছাঃ অমিরন ওরফে আমেনা এবং মৃত ওসমানের ওয়ারিশ কুমারপাড়া গ্রামের মোঃ বাবুল হোসেন, মোঃ সবুজ আলী, মোঃ রোজিনা, মোছাঃ জেসমিন ও মোছাঃ আনোয়ারা বেগমের নামে জমিটি রেকর্ডভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে বিনোদেনী দাশ জীবিত থাকা অবস্থায় ১৯৮৩ সালের ৯ জানুয়ারি ১০৩৩নং সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে জামালপুর সদর উপজেলার ১১নং শাহবাজপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের মৃত সোরহাব আলীর সন্তান মোঃ বেলাল উদ্দিন, মোঃ হেলাল উদ্দিন এবং মৃত সোরহাব আলীর স্ত্রী মোছাঃ গেদিরন নেছা বিবির কাছে ওই সাড়ে ৪৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেন।
ক্রয়ের পর জমির রেকর্ডে ত্রুটি থাকার বিষয়টি জানতে পারেন ক্রেতারা। পরে বিআরএস রেকর্ড সংশোধন ও স্বত্ব ঘোষণার দাবিতে মোঃ বেলাল হোসেন ওরফে বেলাল উদ্দিন, মোছাঃ গেদিরন ওরফে রহিমা বেগম, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ওরফে রুবেল এবং মোঃ রুকন মিয়া ওরফে রুকনুজ্জামান বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, জামালপুরে ১৪২/২০২৪ নম্বর অন্যপ্রকার মোকদ্দমা দায়ের করেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদালতে মামলা দায়েরের পর প্রতিপক্ষ ক্ষিপ্ত হয়ে ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট দুপুরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মির্জাপুর গ্রামের বেলাল উদ্দিনদের বাড়ির বাইডাগে গিয়ে গালিগালাজ শুরু করে। এ সময় বেলাল উদ্দিনসহ পরিবারের লোকজন বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় মোঃ বেলাল হোসেন বাদী হয়ে জামালপুর সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর-৩৫/৫৩২, তারিখ-২৭ আগস্ট ২০২৪। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে এবং আসামিরা জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চলমান মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চলতি বছরের ৫ আগস্ট সকালে আসামিরা পুনরায় বেলাল হোসেনদের বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেন। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
জানমাল ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে রুকনুজ্জামান গত ৬ আগস্ট জামালপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডির নম্বর-৪০২, তারিখ-৬ আগস্ট ২০২৬।
ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা ক্রয়কৃত জমি ভোগদখল করে আসছেন। জমির রেকর্ডে ভুল থাকায় তা সংশোধনের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু মামলা দায়েরের পর থেকেই প্রতিপক্ষের হামলা ও হুমকির কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ অবস্থায় ক্রয়কৃত জমির মালিকানা ও ভোগদখল রক্ষা এবং হামলা-হুমকির কবল থেকে নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ভূমি-মালিকরা।