মোহাম্মদ মাসুদ
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে (৪৪) গুলি করে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ তৃণমূল প্রেস সোসাইটি। দুর্গাপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে সাংবাদিক হত্যার এই বর্বরোচিত ও লোমহর্ষক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশজুড়ে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মো. সুমন সরদার এবং মহাসচিব মীর দিনার হোসেন এ দাবি জানান।
সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেন, এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং মুক্তমতের ওপর সরাসরি আঘাত। বস্তুনিষ্ঠ সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে আজ সাংবাদিকদের জীবন ও পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ তৃণমূল প্রেস সোসাইটি অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে। একই সাথে নিহত সাংবাদিকের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে স্থানীয় অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে ফোন করে আলিফ বলেছিলেন, ‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’
তখন আনন্দিতার কোলে ছিল দেড় বছরের ছেলে আইয়ান সাফওয়ান। চার বছরের মেয়ে প্রান্তি ও ছোট ছেলেকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই গুলির শব্দ শুনতে পান। প্রথমে পটকা ফাটার শব্দ মনে করলেও পরে জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে গুলি করা হয়েছে।
দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে পড়ে থাকতে দেখেন আনন্দিতা। পরে তাঁকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্বামীকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়া আনন্দিতা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমার স্বামীকে তো আর কোনোদিন ফিরে পাব না; কিন্তু যারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আমার অবুঝ দুই সন্তানকে এতিম করল, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক খুব কাছ থেকে আলিফকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক বিশেষ ইউনিট কাজ করছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। জেলার বিভিন্ন প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশিও জোরদার করা হয়েছে।
নিহত সাংবাদিকের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। প্রায় ছয় বছর আগে আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের সংসারে চার বছরের মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছরের ছেলে আইয়ান সাফওয়ান রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন আলিফ। ওই ঘটনার পর আবারও হামলার শিকার হয়ে এবার প্রাণ হারালেন তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।