
মোহাম্মদ মাসুদ
সারাদেশে ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হলো পবিত্র শবে বরাত। এ রাতে পূর্ণময় মুক্তিলাভ, সৌভাগ্যময় রজনী, দোয়া কবুলের রাত। আত্মশুদ্ধি ও ক্ষমা প্রার্থনায় এ রাতের ফজিলতপূর্ণ, বরকতময় অসাধারণ অপরিসীম। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রিয় বান্দাদের জন্য পরবর্তী এক বছরের পূর্ণ বরাদ্দ রিজিক নির্ধারণ বন্টন ভালো-মন্দ সবকিছুই এ রাতে নির্ধারণ হয়ে থাকে মহিমান্বিত এ রাতে। বিশেষ অত্যন্ত রহমতময় বরকতময় মহান মহিমান্বিত রজনী পবিত্র শবে বরাত। যা ধর্মীয় সামাজিক রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের গভীর ভাবগাম্ভীর্য প্রার্থনার পরিবেশের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যশীল ।
এ রাতের গ্রহণযোগ্যতা ও ফজিলত নিয়ে একমত প্রকাশ করেছেন প্রায় সকলেই। সিংহভাগ আলেম-ওলামা মাওলানা পন্ডিত বিশেষজ্ঞদের মতে। তবে কিছু ভিন্নমত থাকলেও এ রাতের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা অপরিসীম অসাধারণ।
এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম নগরীর মসজিদ, মাদ্রাসা ধর্মীয় সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে নিজ গৃহে পারিবারিক সদস্যদের প্রার্থনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রার্থনার আবহে মুখরিত সারাদেশ। দেশের অন্যান্য এলাকার মতো ইবাদত-বন্দেগিতে মুখরিত হয়ে ওঠে নগরীর সকল মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা।
৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) দিনগত রাতে হিজরি শা’বান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী রাতে পালিত হয় মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ রাত।
চট্টগ্রাম নগরীর মসজিদ, সকল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ইবাদতে মশগুল ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মাগরিবের নামাজের পরপরই মসজিদের সমবেত হতে থাকে মুসল্লিগণ। এশার জামাতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ধর্মীয় আলোচনা নফল ইবাদত। মধ্যরাত পেরোতেই—রাত ঠিক ১২টার সময় মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভেতর এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মুসল্লিরা মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। ব্যক্তিগত গুনাহ মাফ, পরিবার-পরিজনের কল্যাণ, দেশ-জাতির শান্তি, সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, শবে বরাত এমন এক বরকতময় রজনী—যে রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন, রহমতের দরজা উন্মুক্ত করেন এবং আন্তরিক তওবাকারীদের ক্ষমা করে দেন। এই বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করেই মুসল্লিরা গভীর মনোযোগ ও বিনয়ের সঙ্গে ইবাদতে মগ্ন থাকেন।
ধর্মীয় মনীষীদের ব্যাখ্যায়, এই রাত মানুষকে আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। কেবল নফল নামাজ বা দোয়াই নয়—অহংকার পরিহার, হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা এবং অন্যের প্রতি জুলুম ও অন্যায় আচরণ থেকে ফিরে আসার প্রতিজ্ঞাই শবে বরাতের মূল শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত।
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান,“এই রাত আমাদের স্মরণ ঢ়করিয়ে দেয়—আল্লাহর রহমত অসীম, কিন্তু সেই রহমত পেতে হলে হৃদয়কে পরিষ্কার করতে হয়। শবে বরাত আমাদের নতুন করে সৎ পথে ফেরার সুযোগ দেয়।”
রাতভর হযরত আলিশাহ (রহঃ) জামে মসজিদে কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া-মোনাজাত, হামদ-নাত এবং নফল ইবাদতের মাধ্যমে পবিত্র রজনীকে অর্থবহ করে তোলা হয়। মুসল্লিদের মধ্যে পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও দোয়ার আদান-প্রদান সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই রাত মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার বার্তা দেয়। জীবন ক্ষণস্থায়ী—এই উপলব্ধি থেকেই মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে, অন্যায় থেকে দূরে থাকার অঙ্গীকার করে এবং ন্যায়ভিত্তিক জীবন গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
মসজিদের শান্ত, সুশৃঙ্খল ও পবিত্র পরিবেশে মুসল্লিদের ইবাদত যেন স্পষ্ট করে দেয়-ইসলাম কেবল আচারনির্ভর ধর্ম নয়, বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সংহতির শিক্ষা প্রদানকারী এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।
এই পবিত্র রজনীতে সম্মিলিত প্রার্থনায় প্রতিফলিত হয়েছে একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা—হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত সমাজ,নৈতিকতা-ভিত্তিক জীবন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও তথ্য মতে, শবে বরাত বা মধ্য-শা’বান (আরবি: نصف شعبان, প্রতিবর্ণীকৃত: নিসফে শাবান ) বা লাইলাতুল বরাত যা উপমহাদেশে এই রাতকে শবে বরাত বলা হয়। ইসলামি বিশ্বাস মতে, এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে বিশেষভাবে ক্ষমা করেন।
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে ইবাদত ও দোয়ায় অংশ নেওয়া সকল মুসল্লির প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা। মহান আল্লাহ যেন এই বরকতময় রাতে আমাদের সকলকে ক্ষমা করেন, অন্তরকে পবিত্র করেন এবং ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে শান্তি, হেদায়েত ও কল্যাণ দান করেন, এই কামনাই সকলের।
মহান আল্লাহতায়ালা সকলের সদইচ্ছা আশা, মনের বাসনা পূরণ করুন। আমীন
Leave a Reply