
রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি
সন্ধ্যা নামলেই বুক কেঁপে ওঠে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার রাতোর ইউনিয়নের মালিভিটা গ্রামের মানুষের। কারণ, গত কয়েক দিন ধরে এই গ্রামে একের পর এক আগুন লাগছে। কোথাও গোয়ালঘর, কোথাও খড়ের গাদা, কোথাও গাছপালা কিংবা পাকা ধানের খেত পুড়ছে। যে সম্পদ গড়তে কৃষকের কেটেছে বছরের পর বছর, তা ছাই হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। ঘটনাগুলোর পেছনে দুর্বৃত্তদের হাত আছে বলে সন্দেহ করছেন গ্রামবাসী। আতঙ্কে তাঁরা এখন রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় শুরু, তারপর থামেনি আগুন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর বুধবার সন্ধ্যা থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের শুরু। ওই সন্ধ্যায় গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর ভাইদের আটটি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বসতবাড়ির পাশের ১৬টি গাছ এবং প্রায় ১৫ শতক জমির ধানও পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, দুই ভাইয়ের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা সবাই বাড়িতেই ছিলাম। হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে বাড়ির বাইরের খড়ের গাদা ও গোয়ালঘরে আগুন জ্বলে ওঠে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনেই সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেল।”
পরদিনও একই আতঙ্ক
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একই এলাকায় আবার আগুন লাগে। এদিন নুরুল হকের খড়ের ঘরে আগুন দেওয়া হলে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। একই দিন রাত ১০টার দিকে সেকেন্দার আলীর খড়ের ঘর ও গোয়ালঘরসহ তিনটি ঘর এবং চারটি গাছ পুড়ে যায়। তাঁর আনুমানিক ক্ষতি দুই লাখ টাকা।
আগুনের ধরন দেখে সন্দেহ জেগেছে সেকেন্দার আলীর মনে। তিনি বলেন, “রাতে ঘর থেকে বের হয়ে আগুনের ভয়াবহতা দেখে অবাক হয়ে যাই। আমাদের ধারণা, দ্রুত আগুন ছড়িয়ে দিতে দুর্বৃত্তরা বিশেষ কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতে পারে।”
এত কিছুর পরও থামেনি আতঙ্ক। গত শনিবার রাতে আলহাজ্ব শামসুল হকের বাড়ির উঠানের একটি খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় পুরো গ্রামে ভয় আরও গভীর হয়েছে।
দিনে মাঠে খাটুনি, রাতে পাহারা
স্থানীয়দের হিসাবে, এ পর্যন্ত সাত থেকে আট লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানান, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে যায়।
বাধ্য হয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ বাঁচাতে রাত জেগে গ্রাম পাহারার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গ্রামবাসী। কিন্তু সারা দিন মাঠে কাজ করে রাতভর জেগে থাকা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে পরিবারগুলোর।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, কোনো চক্র পরিকল্পিতভাবে এসব অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, আগুনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
থানায় অভিযোগ, প্রশাসনের আশ্বাস
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সিরাজুল ইসলামের ভাই রফিকুল ইসলাম রাণীশংকৈল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
রাণীশংকৈল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারী বলেন, ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করেছেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইশরাত জাহান বলেন, মালিভিটা গ্রামে আগুন লাগার ঘটনা তিনি শুনেছেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখন মালিভিটার মানুষের একটাই প্রত্যাশা: দ্রুত আসল রহস্য উন্মোচিত হোক, দোষীরা শাস্তি পাক, আর তাঁরা আবার নির্ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারুন।
রাণীশংকৈল প্রতিনিধি | ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সংবাদে আমি শুধু আপনার দেওয়া তথ্যই রেখেছি, নতুন কোনো তথ্য বা উদ্ধৃতি যোগ করিনি। চাইলে আরও ছোট সংস্করণ বা ফেসবুক পোস্টের জন্য সারসংক্ষেপ করে দিতে পারি।
Leave a Reply