
মিরাজুল শেখ, জেলা প্রতিনিধি বাগেরহাট:
বাগেরহাট সদর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের রণজিৎপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক সরদার মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে অশোভন মন্তব্য, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং মানসিকভাবে বিব্রতকর আচরণের অভিযোগ করেছেন।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণা দাস অভিযোগ করে বলেন, শারীরিক শিক্ষক মাহবুবুর রহমান ক্লাসে এসে ছাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। কখনো গায়ে হাত দেন কখনো কারও ওড়না ধরে টান দেন। এছাড়া ছাত্রীদের নিজের চোখের দিকে তাকাতে বলেন এবংমনের ভাষা পড়ে দিতে পারি” এমন মন্তব্য করেন। অনেক সময় কপালের টিপ সরিয়ে দেন এবং মাঝেমধ্যে চোখ মারেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী টলি মজুমদার বলেন, স্যার আমাদের বলেন—আমার চোখের দিকে তাকাও, আমি তোমার মন পড়ে নিতে পারব। যদি তোমার মন নিয়ে নিই, তাহলে আর ফেরত দেব না। এ ধরনের মন্তব্যে তারা অস্বস্তিতে পড়েন বলে জানান তিনি।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী পাটোয়ারী বলেন, ওই শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেন। পড়া পারুক বা না পারুক, তিনি অপমান করেন। ছাত্রীদের কপালে টিপ দেওয়া ও গায়ে হাত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বপ্ন দাস বলেন,শিক্ষক আমাদের কাছে সম্মানীয় ব্যক্তি। কিন্তু স্যার ক্লাসে এসে পড়াশোনার বদলে উল্টাপাল্টা কথা বলেন। মেয়েদের গায়ে হাত দেন, এমনকি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ঘাড়ে হাত দিয়ে নামেন। এতে আমরা বিব্রত বোধ করি।
আরেক শিক্ষার্থী নাজিফা খাতুন অভিযোগ করেন, কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তিনি বলেন,স্যার মাঝে মাঝে এমন অশালীন গল্প বলেন, যা আমরা কাউকে বলতে পারি না। তার আচরণ আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক সরদার মাহবুবুর রহমানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
রণজিৎপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক দাস এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে অভিযোগের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিভাবক ইলিয়াস শেখ বলেন, তার মেয়ে আগে ওই বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। তিনি অভিযোগ করেন, মাহবুব স্যারের আচরণের কারণে আমি আমার মেয়েকে ওই স্কুল থেকে সরিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি। শুধু আমার নয়, এলাকাবাসীর অনেকের একই অভিযোগ। স্যার নাকি ছাত্রীদের বলেন পাস করিয়ে দিতে হলে তার সঙ্গে বাইরে যেতে হবে। একজন শিক্ষক স্কুলের সামনে দোকানে বসে ধূমপান করেন। সেখানে ছেলে-মেয়েদের স্বাভাবিকভাবে যাওয়ার পরিবেশ নেই।তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
প্রাক্তন শিক্ষার্থী হবিব বলেন,স্যারের আচরণ দীর্ঘদিন ধরেই অস্বাভাবিক। আমরা একসময় শতাধিক শিক্ষার্থী মিলে প্রতিবাদ করেছিলাম এবং তাকে সতর্ক করেছিলাম। কিন্তু এরপরও তার আচরণে পরিবর্তন আসেনি।
বাগেরহাট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, রণজিৎপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে এখনো তার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাগেরহাট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাদেকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে কিছু আপত্তিকর বিষয় তার নজরে এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শিক্ষক সমাজে সম্মানীয় ব্যক্তি। অভিভাবকরা যদি শিক্ষকের কাছে সন্তানদের নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
অভিযোগের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply