
সেলিম মাহবুবঃ
ছাতকে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেলো ২১ গ্রামের কৃষকের স্বপ্ন। পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে হাওরে পানি ঢুকে কাঁচা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজারো কৃষক।
চলতি বোরো মৌসুমে ছাতক উপজেলায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ২৭ প্রকল্পের মাধ্যমে (পিআইসি) সরকারি প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও পূর্বের অধিকাংশ পিআইসি বহাল রেখে কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ শুরু থেকেই ছিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বরাদ্দও দেয়া হয়েছে। কিন্ত চরমহল্লা ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাড়ুকা বিল, বাগেছড়া বিল, গোজাগাট্টি বিল ও বুড়াইর গিরি বিল প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।এসব বিলে ২১ গ্রামের কৃষকদের বোরো ফসল রয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এসব বিলকে ফসল রক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছেও লিখিত আবেদন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরেও পুনরায় আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এসব বিলের ফসল রক্ষা করতে চলতি মৌসুমে স্থানীয়দের অর্থায়নে এবং স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করেন কৃষকরা। এতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও সরকারি তদারকি ছিলনা। ক’ দিনের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে স্থানীয়দের দেয়া বাঁধ ভেঙে বিল-হাওরের কাঁচা-পাকা বোরো ফসল তলিয়ে যায়। বিলগুলোতে পানি ঢুকায় কৃষকদের ভাষ্যমতে ২১ টি গ্রামের কৃষকরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তারা বলেছেন “আমরা আগেই প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছি সময়মতো ব্যবস্থা নিলে আজ আমাদের এই সর্বনাশ হতো না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী(ছাতক দায়িত্ব) সৈয়দুজ্জামান নাহিদ বলেন “যেসব হাওর- বিল পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাভুক্ত নয়, সেসব হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ পিআইসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয় না। হাওরের ভাঙা বাঁধ স্থানীয় কৃষকরা নিজ উদ্যোগে মেরামত করেন। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন, ছাতক উপজেলা শাখার আহবায়ক দিলোয়ার হোসেন বলেন “শুরু থেকেই এখানে অনেক পিআইসিতে অপরিকল্পিতভাবে কাজ হয়েছে। কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ, কোথাও কাজের অনিয়মের অভিযোগ ও কোথাও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে পিআইসির অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। বাঁধ পরিদর্শনে গিয়ে এসব তথ্য পেয়েছি। চরমহল্লার বাগেছড়া হাওরকে পিআইসির আওতায় আনা হলে হয়তো কৃষকদেরকে এমন ক্ষতির মুখে পড়তে হতো না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নাছির উদ্দিন বলেন, কৃষকরা বারবার সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বিল হাওরটি পিআইসির আওতায় আনার চেষ্টা করেছেন। পরে নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করেও শেষ রক্ষা হয়নি।
চরমহল্লা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন “হাওরে পানি ঢুকে ধান তলিয়ে গেছে। কয়েকটি বিল মিলে এখানে বড় হাওরের মতো এলাকায় বোরো ফসল ফলানো হয়ে থাকে। পিআইসির আওতায় থাকলে এখানে ক্ষতির সম্ভাবনা অনেক কম ছিল।” তিনি জানান, অন্তত ১৫ টিরও বেশি গ্রামের কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান বলেন, “বাগেছড়া হাওরে ৩৭ হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। সেখানে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশের খবর কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। তবে ছাতকের অন্য কোনো হাওরে বাঁধ ভাঙার খবর এখনও পাওয়া যায়নি।”
বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, “উক্ত হাওরের উপকারভোগী কৃষকরা ২০২৫ সালে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেন বলে জেনেছি। তবে পূর্বে এ বিলগুলো পিআইসির আওতা ভুক্ত ছিল না। চলতি মৌসুমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হতো। ভবিষ্যতে বিল- হাওর পিআইসির আওতায় আনা যায়, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Leave a Reply