
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অর্থনৈতিক হৃদপিন্ড আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫০ কনটেইনার সমন্বয়হীন তত্ত্ব বিতর্ক। তথ্য বিভ্রাট নাকি ষড়যন্ত্র ?
নাকি ভিন্ন ইস্যু রহস্য ? ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ, সত্য উদঘাটনের দাবি সচেতন মহল সকলের।
কনটেইনার ইস্যুতে সমন্বয়হীন তত্ত্বে বিতর্কে তোলপাড় সারাদেশ। যা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ, জনমনে নানা কৌতুহল। অসামঞ্জস্য সমন্বয়হীন তত্ত্বের নেপথ্যে আমদানি-রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা, দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি, দেশে ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের আশঙ্কা, বিদেশি ক্রেতাদের ভুল ধারণা, আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত। নানা প্রশ্নবিদ্ধ জটিলতায় ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একটি কনটেইনারও নিখোঁজ হয়নি। সত্য তথ্য মিলিয়ে দেখলে কনটেইনার হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না; বরং এটি তথ্য হালনাগাদ ও সমন্বয়ের বিষয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে সমন্বয়হীন তত্ত্বে বিতর্কমাত্র।
তবে বিষয়টি নিয়ে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। ফলে এটি প্রকৃতপক্ষে কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, নাকি তথ্যগত অসামঞ্জস্য, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রহস্য।
প্রতিবছর বন্দর দিয়ে প্রায় ৩৪ থেকে ৩৫ লাখ কনটেইনার ওঠানামা (হ্যান্ডলিং) হয়। দেশের মোট সমুদ্রপথে আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগই এই বন্দরনির্ভর। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্প, ব্যবসা-
বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম ভিত্তি। একটি মহল বন্দর ইস্যুতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যা দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র নানা অপ্রাসঙ্গিক অসঙ্গতি তথ্যে। ষা আলোচনা সমালোচনায় ব্যাপক আলোচিত হয় সারাদেশে। নানা ইস্যুতে নানা গুঞ্জনে প্রচারিত হয় সোশ্যাল মিডিয়া গণমাধ্যমে।
সম্প্রতি “২৫০টি পণ্যবোঝাই কনটেইনারের হদিস নেই”—এমন একটি তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বন্দর ইস্যুতে সারাদেশে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শীর্ষ আলোচিত ও ননা গুঞ্জনে প্রচারিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন জনমনে কাস্টমসের বক্তব্য কী?
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি, ভুল ঘোষণা কিংবা সন্দেহজনক চালানের অভিযোগে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেমে লক করে রাখা প্রায় ২৫০টি কনটেইনারের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। কাস্টমসের দাবি, এসব কনটেইনারের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করতে তারা একাধিকবার বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়েছে এবং এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছে। তাদের মতে, ডিজিটাল রেকর্ডে অসামঞ্জস্য থাকলে তা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাস্তব ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ যা বলছে , চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমসের এই দাবির সঙ্গে একমত নয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একটি কনটেইনারও নিখোঁজ হয়নি। বন্দর সূত্রে জানানো হয়েছে—* ৮৮টি কনটেইনার কাস্টমসের বৈধ আউটপাসের মাধ্যমে নিয়ম অনুসারে ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে। * ৭০টি কনটেইনার বিভিন্ন অফডকে (Inland Container Depot-ICD) স্থানান্তর করা হয়েছে। * ১৩১টি কনটেইনার এখনো বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে সংরক্ষিত রয়েছে। * কাস্টমসের পাঠানো তালিকার কয়েকটি বিল অব লেডিং (BL) নম্বরেও ভুল বা অসঙ্গতি রয়েছে বলে বন্দর দাবি করেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একটি কনটেইনারও নিখোঁজ হয়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, তথ্য মিলিয়ে দেখলে কনটেইনার হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না; বরং এটি তথ্য হালনাগাদ ও সমন্বয়ের বিষয়।
সূত্রে আরও জানা যায়, সাধারণত একটি কনটেইনার কীভাবে বন্দরে পরিচালিত হয় ? বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কনটেইনার বন্দরে প্রবেশের পর থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে- * জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস, * ডিজিটাল এন্ট্রি ও রেকর্ড সংরক্ষণ, * সিসিটিভি নজরদারি, * কাস্টমসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, * শিপিং এজেন্টের তথ্য যাচাই, * বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, * নিরাপত্তা বাহিনীর তদারকি, * আউটপাস ইস্যু এবং * চূড়ান্ত ডেলিভারি।

এতগুলো ধাপ অতিক্রম করে কোনো কনটেইনার রেকর্ড ছাড়া হারিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তাই এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অতি জরুরি।
তবে প্রশ্ন, কেন উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা? তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে- * আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, * বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে, * আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে, * দেশের ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন এ ধরনের বিভ্রান্তি চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
বিদেশি অপারেটর প্রসঙ্গেও আলোচনা: এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ কারণে বন্দরসংশ্লিষ্ট একটি মহলের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলে বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ততার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই আশঙ্কার পক্ষে বর্তমানে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে নয়, বরং আলোচনায় থাকা একটি মতামত হিসেবেই দেখা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতামতে, বন্দর ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আর যদি এটি কেবল তথ্যগত বিভ্রাট, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি অথবা ডিজিটাল রেকর্ডের অসামঞ্জস্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও দ্রুত পরিষ্কারভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে তথ্য যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশ করলে সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর হবে এবং ব্যবসায়ীদের আস্থাও বজায় থাকবে।
দেশ ও বন্দরের স্বার্থে সত্য প্রকাশই সবচেয়ে জরুরি:
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে যেকোনো তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই অভিযোগ কিংবা পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সত্য উদঘাটনই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন।
দুর্নীতি, অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা কোথাও থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য বিভ্রাট বা ভুল বোঝাবুঝি থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
বস্তুনিষ্ঠ, তথ্যনির্ভর ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য তুলে ধরা সম্ভব। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম, দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
উল্লেখ্য : একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র বন্দর নিয়ে সমন্বয়হীন তত্ত্বে অসত্য প্রকাশে দায়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সীমাবদ্ধতা আছে। সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কাস্টমস, বন্দর, শিপিং এজেন্ট, অফডক ও অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের নির্দিষ্ট কার্যক্রম বিশ্লেষণে বাস্তব নথি বা যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়া সত্য হিসেবে ইতিবাচক কাম্য নয়। অনুসন্ধানী তথ্যে সত্য সংবাদে বিশ্লেষণে সময় উপযোগী বিস্তৃত প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
Leave a Reply