
হুমায়ুন কবির (ঠাকুরগাঁও)প্রতিনিধি:
মৃত্যু কখনো কখনো এমন এক সত্যের সামনে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন, মতাদর্শের ভিন্নতা কিংবা দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও অর্থহীন হয়ে পড়ে। ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সাতবারের সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও উত্তরবঙ্গের বর্ষীয়ান রাজনীতিক মো. দবিরুল ইসলামের শেষ বিদায়ে সেই বিরল দৃশ্যেরই সাক্ষী হলো ঠাকুরগাঁও। জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক নেতা, কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা প্রমাণ করলো—তিনি শুধু একটি দলের নন, ছিলেন সমগ্র জনপদের একজন অভিভাবক, একজন আস্থার নাম। শনিবার (৩০ মে) বিকেলে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার শহীদ আকবর আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর নামাজে জানাজা। সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ নয়, যেন মানুষের স্রোত নেমে আসে প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য। মাঠ, আশপাশের সড়ক, অলিগলি—সবখানেই ছিল শোকাহত মানুষের উপস্থিতি। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে স্মৃতিচারণ, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রদ্ধাভরে।
জানাজার আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা আর সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা মিলেমিশে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। তবে পুরো আয়োজনের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের অনন্য দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস পেছনে ফেলে প্রয়াত নেতার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে তাঁর বাসভবনে ছুটে যান ঠাকুরগাঁও-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ডা. আব্দুস সালাম। ব্যস্ততার কারণে জানাজায় উপস্থিত হতে না পারলেও তিনি পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং গভীর শোক প্রকাশ করেন। এই সৌজন্যমূলক আচরণ স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে ধরা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু মানবিকতা ও সম্মানবোধই সুস্থ রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়। জানাজায় শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই নন, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা আব্দুল হাকিম বলেন, “এ অঞ্চলের দৃশ্যমান উন্নয়নের সঙ্গে দবিরুল ইসলামের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।”বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হায়াত নুরুন্নবী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “দবিরুল ইসলামের অবদানের কাছে বালিয়াডাঙ্গীবাসী চিরঋণী। রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়িয়ে তিনি ছিলেন এলাকার মানুষের আপনজন।”স্থানীয় আইনজীবী, শিক্ষক, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন দৃশ্য বিরল। আদর্শের লড়াই রাজনৈতিক ময়দানে সীমাবদ্ধ থাকলেও একজন মানুষের কর্ম, অবদান ও মানবিকতার মূল্যায়ন হওয়া উচিত দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে। ১৯৪৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড়বাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন দবিরুল ইসলাম। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে রাজনৈতিক পথচলা শুরু করে জনমানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় তিনি টানা সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় নেতা হিসেবে। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকেলে ঢাকার একটি হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
জানাজা শেষে বড়বাড়ী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। একজন রাজনীতিকের মৃত্যুতে মানুষের শোক নতুন কিছু নয়। কিন্তু দবিরুল ইসলামের বিদায়ে যে দৃশ্য দেখা গেল, তা ছিল আরও বড় কিছু—এটি ছিল একজন মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, রাজনৈতিক সহনশীলতার এক বিরল বার্তা এবং স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে প্রকৃত জননেতারা দলীয় সীমারেখার ভেতরে আবদ্ধ থাকেন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন পুরো জনপদের সম্পদ। দবিরুল ইসলামের শেষ যাত্রা তাই শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্যের বিদায় নয়, বরং একটি প্রজন্ম, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনমানুষের প্রতি নিবেদিত এক দীর্ঘ অধ্যায়ের আবেগঘন সমাপ্তি।
Leave a Reply