
হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
স্বামী নেই, সন্তানরা থাকতেও যেন নেই। শেষ বয়সে যাদের হাত ধরে বেঁচে থাকার কথা, সেই সন্তানদের অবহেলা আর অনিশ্চয়তার ভারে একাকী জীবন কাটাচ্ছেন ঠাকুরগাঁওয়ের বৃদ্ধা আয়েশা খাতুন। মৃত্যুর পরও সন্তানরা পাশে থাকবেন কি না—এমন শঙ্কা থেকেই জীবিত থাকতেই নিজের কবর খুঁড়ে রেখেছেন তিনি। ঘরের পাশেই তৈরি করে রেখেছেন নিজের শেষ ঠিকানা। এখন প্রতিদিন সেই কবরের পাশ দিয়ে চলাফেরা করেন আর নীরবে অপেক্ষা করেন জীবনের শেষ দিনের।ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা খাতুনের এমন জীবনযাপন স্থানীয়দের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তাঁর নিজের কবর তৈরি করে রাখার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই সন্তানদের অবহেলায় অনেকটা নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন আয়েশা খাতুন। তাঁর অভিযোগ, ছেলেরা সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর খোঁজখবর নেওয়া কমিয়ে দেন। কিছুদিন বড় ও ছোট ছেলের বাড়িতে থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় সেখান থেকেও চলে আসতে হয় তাঁকে। একপর্যায়ে স্বামীর দেওয়া আড়াই শতাংশ জমিতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি ছোট ঘর তৈরি করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন তিনি। সেই ছোট ঘরটিই এখন তাঁর একমাত্র আশ্রয়।জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সন্তানদের ওপর আস্থা হারিয়ে আয়েশা খাতুন ঘরের পাশেই নিজের কবর খনন করিয়ে রেখেছেন। তাঁর ভাষায়, মৃত্যুর পর তাঁকে কে দাফন করবে, সেই নিশ্চয়তাটুকুও তিনি পাননি। তাই বেঁচে থাকতেই নিজের শেষ ঠিকানা তৈরি করে রেখেছেন। আবেগঘন কণ্ঠে আয়েশা খাতুন বলেন, ‘সন্তানদের জন্ম দিয়েছি, নিজের সাধ্য অনুযায়ী মানুষ করেছি। শেষ বয়সে ভেবেছিলাম, সন্তানরাই আমার পাশে থাকবে। কিন্তু এখন আমি একা। মরে গেলে আমাকে কে দাফন করবে, কোথায় রাখবে—সেই চিন্তাই আমাকে কষ্ট দেয়। তাই বেঁচে থাকতেই নিজের কবর করে রেখেছি। আমার শেষ ইচ্ছা, মৃত্যুর পর যেন এই কবরেই আমাকে দাফন করা হয়।’স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় পাঁচ বছর ধরে আয়েশা খাতুন একাই কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তাঁর সন্তানরা আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ এগিয়ে আসছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শেষ বয়সে এসে সন্তানদের ভালোবাসা ও আশ্রয়ের বদলে নিজের কবরের পাশেই ভবিষ্যতের শেষ ঠিকানা খুঁজে নিয়েছেন এই বৃদ্ধা। আয়েশা খাতুনের এই করুণ জীবনকাহিনি স্থানীয়দেরও ব্যথিত করেছে। তাঁদের দাবি, একজন অসহায় বৃদ্ধা যেন জীবনের শেষ সময়ে অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, সে জন্য প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। এ বিষয়ে আয়েশা খাতুনের সন্তানদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের অন্য কয়েকজন সদস্য বৃদ্ধার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
Leave a Reply