
রুমানা আক্তার, ঢাকা::
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় পরিচালিত “TastyTreat” নামের একটি খাবারের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা, নিম্নমানের খাবার বিক্রি এবং কাস্টমারদের সঙ্গে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মচারীর আচরণ নিয়ে ক্ষোভ জমে থাকলেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সেই ক্ষোভ আরও বেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত সময় পার হওয়া খাবারও বিক্রি করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেককে। স্থানীয়দের একটি অংশ বলছেন, দ্রুত তদন্ত না হলে ভোক্তারা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
“ইচ্ছাকৃতভাবে গরম কফি ঢেলে দেওয়ার” অভিযোগ
দৈনিক আমাদের কণ্ঠ-এর সিনিয়র রিপোর্টার রোমানা অভিযোগ করে বলেন, তিনি কফি পান করতে গেলে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী ইচ্ছাকৃতভাবে তার গায়ে গরম কফি ঢেলে দেন। এতে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন বলে দাবি করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তিনি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাননি। বরং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় উপস্থিত কয়েকজন কাস্টমারও বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, কাস্টমারদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রির অভিযোগে উদ্বেগ
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে সংরক্ষিত কিছু খাবার নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও বিক্রি করা হচ্ছে। কয়েকজন কাস্টমার দাবি করেন, খাবারের স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সেসব অভিযোগ গুরুত্ব পায়নি।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের খাবার শুধু প্রতারণাই নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এমন খাবার ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় খাবারের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে কাস্টমারদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ অভিযোগ করতেও ভয় পান।
সার্ভিস নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ
আদাবর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, শাখাটিতে কর্মরত কিছু ব্যক্তি প্রায়ই কাস্টমারদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তাদের দাবি, খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেই উল্টো কাস্টমারদের হেনস্তা করা হয়।
এছাড়া “ইশা” নামের এক সার্ভিস ম্যানের বিরুদ্ধেও প্রতারণামূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানের আচরণ পুরো এলাকার ব্যবসায়িক পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। এমন ঘটনা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।
তদন্ত ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের দাবি
এলাকাবাসী দাবি জানিয়েছেন, খাদ্য অধিদপ্তর, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত চালানো হোক। একইসঙ্গে র্যাব ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনারও দাবি উঠেছে।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রি কিংবা কাস্টমারদের সঙ্গে খারাপ আচরণের মতো বিষয়গুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
কেন বাড়ছে এমন অভিযোগ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীতে দ্রুত বাড়তে থাকা ফুড ব্যবসার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানে মান নিয়ন্ত্রণ ও কাস্টমার সার্ভিসে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্মচারীদের দায়িত্বে রাখা হয়, যার প্রভাব পড়ে গ্রাহকসেবায়।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠান বাস্তবে সেই মান ধরে রাখতে পারছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে কাস্টমারদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, প্রতারণার অভিযোগ কিংবা স্বাস্থ্যঝুঁকির ঘটনা বাড়ছে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকজন সচেতন নাগরিক মনে করেন, নিয়মিত মনিটরিং এবং কঠোর নজরদারি না থাকলে এমন অনিয়ম আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কাস্টমারদেরও সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
স্থানীয়রা বলছেন, ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রতিষ্ঠানে কাস্টমারদের সঙ্গে এমন অসভ্য আচরণ না ঘটে, সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সেলস গার্ল ও বয়দের আচরণগত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
একাধিক বাসিন্দা জানান, “একজন কাস্টমার যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে যান, তখন তিনি সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশা করেন। সেখানে যদি উল্টো অপমান বা প্রতারণার শিকার হতে হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়, পুরো সমাজের জন্যই উদ্বেগের।”
এ ঘটনায় এলাকাবাসী তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি তুলেছেন।
Leave a Reply