
মোহাম্মদ মাসুদ
চট্টগ্রামে দীর্ঘ ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করার সুযোগ নিয়ে প্রায় শত ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে রোমেন দে (৩৬) নামে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশের অভিযানে আত্মসাৎ করা ৫৫ পিস স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার** এবং মামলায় ৬ জনকে গ্রেপ্তার** করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পুলিশ তথ্যে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট ঘটনায় ১৫ আগস্ট মামলা হওয়ার পর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ তদন্তে নামে।১৮ আগস্ট রাত ২টার দিকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট মহাসড়ক এলাকা থেকে রোমেন দেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচলাইশ থানাধীন মিমি সুপার মার্কেটের **নিউ কনক বাহার জুয়েলার্সে** দীর্ঘদিন ধরে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন রোমেন দে। গত ১৪ আগস্ট দোকানের স্টক মিলানোর সময় স্বর্ণের হিসাবে গরমিল ধরা পড়ে। পরে দেখা যায়, ৭টি বাক্সে রাখা ৫৩টি আসল স্বর্ণের চুড়ির পরিবর্তে ইমিটেশন চুড়ি** রাখা হয়েছে। আত্মসাৎ করা স্বর্ণের ওজন ছিল প্রায় ৭৯.৫১ ভরি**, যার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০০ টাকা।
বিষয়টি বুঝতে পেরে রোমেন দে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে দোকান থেকে পালিয়ে যান বলে পুলিশের দাবি। ১৫ আগস্ট মামলা হওয়ার পর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ তদন্তে নামে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) শওকত ইমামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তথ্যপ্রযুক্তি ও সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালায়। পরে ১৮ আগস্ট রাত ২টার দিকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট মহাসড়ক এলাকা থেকে রোমেন দেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালত তাঁর তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আত্মসাৎ করা স্বর্ণ বিভিন্ন জুয়েলার্স ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছে রাখার তথ্য পাওয়া যায়।
এক জুয়েলার্সে ৪৬ চুড়ি বন্ধক : পুলিশের দাবি, রোমেনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়া এলাকা থেকে **শ্যামল সিংহ (৪৭)** নামে এক জুয়েলার্স ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকলিয়ার মিয়াখান নগরের **মর্ডাণ ইরানী জুয়ের্লাস** থেকে ৭টি স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার করা হয়।

পরে বিভিন্ন জুয়েলার্স ও বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আরও চুড়ি উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে মর্ডাণ রিনা জুয়ের্লাস, সাহা জুয়েলার্স এবং কয়েকজন বন্ধকী ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ছাড়া রোমেনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাকলিয়ার মর্ডাণ রিয়া জুয়ের্লাস, শাহ আমানত জুয়ের্লাস এবং চকবাজারের ফেন্সী জুয়ের্লাস ও তাজমহল জুয়ের্লাস থেকেও চুড়ি উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার ৫৫ পিস, ওজন ৯৯ ভরি ৪ আনা ৫ রতি: পুলিশের দেওয়া হিসাবে, সব মিলিয়ে **৫৫ পিস স্বর্ণের চুড়ি উদ্ধার হয়েছে। এসব স্বর্ণের মোট ওজন ৯৯ ভরি ৪ আনা ৫ রতি বা ১ হাজার ১৫৮ দশমিক ৩৩ গ্রাম।**
তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারী কি একাই এই বিপুল স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছেন, নাকি এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত? স্বর্ণগুলো কীভাবে দোকান থেকে বের করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বন্ধক রাখার ক্ষেত্রে কারা সহযোগিতা করেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
বিশ্বস্ততার আড়ালে বড় কারসাজি? : দীর্ঘদিনের কর্মচারীর ওপর আস্থা রেখে মূল্যবান স্বর্ণের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি যেমন আলোচনায় এসেছে, তেমনি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্টক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় শত ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের এই ঘটনায় পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে স্বর্ণ উদ্ধারের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকা এবং স্বর্ণের সম্পূর্ণ গতিপথ বের করাই এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য।
Leave a Reply