
মোঃ মোঃআব্দুল হামিদ সরকার নিলফামারী ( জেলা) প্রতিনিধিঃ
পূর্ব আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবী সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে। চারদিকে পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত। এমনই পরিবেশে কৃষকের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ভানে গৃহিণীরা। পাখির কিচিরমিচির ডাকের সঙ্গে ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ ভেসে বেড়ায় কৃষকের আঙিনায়। বলছিলাম আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকির কথা যা এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। এক সময় ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি লুকিয়ে ছিল আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন জনপদে। ঠিক তেমনি অামাদের গ্রাম গুলোতেও একসময় ঢেঁকির প্রচলন ছিল। ভোরের আজানের পাশাপাশি স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির শব্দ ছড়িয়ে পরত গাঁও গ্রামে র চারদিকে। এখন সেই শব্দ আর শোনা যায় না। চোখে পড়ে না বিয়ে স্বদির উৎসবের ঢেঁকি ছাঁটা চালের ফিরনি-পায়েস। অথচ একদিন ঢেঁকি ছাড়া গ্রাম কল্পনা করাও কঠিনতর ছিল। যেখানে বসতি ছিল সেখানেই ঢেঁকি ছিল। কিন্তু আজো তা আমাদের আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও মাঝে মধ্যে গ্রামীণ জনপদে কিছু উৎসব-পার্বণে পিঠা বানানোর জন্য চালের গুঁড়ি তৈরি করতে পুরোনো ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ শোনা যায়। আত্মীয়-স্বজন একসঙ্গে ঢেঁকিতে পা-র দিয়ে চালের গুড়ো তৈরীতে যে আনন্দ পেয়ে থাকে তা কলে ছাঁটায় পাওয়া কখনও সম্ভব নয়। এখন শিক্ষার প্রসার গ্রামেও বিস্তার লাভ করেছে। গ্রামের বউ-ঝিরা বলতে গেলে প্রচলন না থাকাই অবশ্য ঢেঁকির এসব কর্মকান্ড প্রায় ভুলেই গেছে। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া বৃদ্ধা বা বয়স্ক মা-বোনে রা গর্ব করে বলত এই ঢেঁকি আমার দাদা শ্বশুরের হাতের। শীতকালের পাখি ডাকা ভোরে নবান্নের আনন্দে মেতে উঠত অজো পাড়া গাঁ। এ সময় ঢেঁকির শব্দ কৃষককে মাঠে যাওয়ার জন্য তাড়া দিত। গ্রাম বাংলার ঘোমটা পরা বধূরা বিভিন্ন কায়দা-কানুনে ঢেঁকির তালে তালে তাদের বাপ-দাদার আমলের গীত গেয়ে চলত। কিন্তু এখন সর্বত্রই অসংখ্য যান্ত্রীক ধান ভাঙার মেশিন ঢেঁকির সেই মধুময় ছন্দ কেড়ে নিয়েছে। গ্রামীণ জনপদেও সেই কর্ম চঞ্চল্য স্তব্ধ করে দিয়েছে । ঢেঁকি একটি শিল্প। এক সময় ঢেঁকি শিল্পের ব্যাপক কদর ছিল। ছিল ঢেঁকি থেকে উৎপাদিত চালের ব্যাপক প্রচলন। লাখ লাখ পরিবার সরাসরি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। তৎকালীন সময়ে ঢেঁকিতে চাল ভানানী মা-বোন রা তাদের উৎপাদিত চাল বিক্রি করে আর্থিকভাবে যে টুকু লাভবান হতো তাতে করে তারা কেবল নিজেদের সংসার।
Leave a Reply