
হুমায়ুন কবির, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড”—এই চিরন্তন বাণীটি যেন বাস্তব রূপ পেল এক অনাড়ম্বর অথচ হৃদয়স্পর্শী আয়োজনের মধ্য দিয়ে। কারণ, একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকেন না; তিনি মানবিক মূল্যবোধে আলোকিত মানুষ গড়ে তোলেন, সমাজকে নির্মাণ করেন নীরবে, অবিচল নিষ্ঠায়। আর সেই মহান দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ পথচলার ইতি টেনে বিদায়ের সুর তুললেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ রাণীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইসমাইল হোসেন। সোমবার (৪ মে) দুপুরে কলেজের হলরুমে আয়োজিত বর্ণাঢ্য বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কলেজের অধ্যক্ষ জাকির হোসেন হেলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতাউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আল্লামা ওয়াদুদ বিন নূর আলিফ, পৌর বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক শাহজাহান আলী, জামায়াতের নায়েবে আমির মিজানুর রহমান এবং যুববিভাগের নেতা মোকাররম হোসেন। এছাড়াও গভর্নিং বডির সদস্য আলাউদ্দিন, সাবেক কাউন্সিলর রুহুল আমীন, বিএনপির সহসভাপতি শাহাদাত আলী, পৌর সম্পাদক মহসিন আলী, সহকারী অধ্যাপক আশরাফ আলীসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ বলেন, “আজ আমাদের কলেজ একজন নিবেদিতপ্রাণ, দক্ষ ও মানবিক শিক্ষককে হারাল। তাঁর অবদান আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও অবসর জীবনের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল কামনা করি।” প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে শিক্ষকের মর্যাদা ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন,“একজন শিক্ষকের বিদায় মানেই একটি যুগের অবসান। তবে তাঁর আদর্শ, শিক্ষাদর্শন ও মূল্যবোধ যদি আমরা ধারণ করতে পারি, তবেই তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব।”

তবে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ছিল বিদায়ী শিক্ষক ইসমাইল হোসেনের আবেগমথিত বক্তব্য। অশ্রুসজল নয়নে তিনি বলেন,“এই বিদ্যাপীঠ আমার কাছে শুধু কর্মস্থল নয়—এটি আমার আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম। এখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, শিক্ষার্থীদের হাসিমুখ, সহকর্মীদের আন্তরিকতা—সবকিছুই আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। বিদায় নিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসার এই বন্ধন কখনো ছিন্ন হবে না। তোমরা সবাই প্রকৃত মানুষ হও—এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।”
তিনি আরও বলেন, “সময় বড় নির্মম—সে কারো জন্য অপেক্ষা করে না। বিদায় তাই অবশ্যম্ভাবী। তবুও আমি আশাবাদী, এই প্রতিষ্ঠান একদিন জাতীয়করণের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হবে এবং আমার শিক্ষার্থীরা দেশের গর্ব হয়ে উঠবে।” অনুষ্ঠানের শেষে কলেজের পক্ষ থেকে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা ক্রেস্ট ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত সকলের চোখে ছিল অশ্রুর ঝিলিক, আর হৃদয়ে গভীর কৃতজ্ঞতার অনুরণন।
শেষ মুহূর্তে কলেজ প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে বিদায়ী এই শিক্ষক যেন স্মৃতির ক্যানভাসে আঁকছিলেন তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের রঙিন অধ্যায়গুলো। বিদায় বেদনাদায়ক—তবুও সময়ের কাছে আমরা সবাই নতিস্বীকার করি। আর সেই স্বীকারোক্তির অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক মহান জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অমলিন স্মৃতির আবেশ।
Leave a Reply