
হুমায়ুন কবির, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। কুয়াশাভেজা পথ ধরে কেউ কাঁধে কোদাল, কেউ হাতে কাস্তে, আবার কেউ শাবল কিংবা ডালি নিয়ে ছুটে আসছেন শহরের মোড়ে মোড়ে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার আমজুয়ান ইউনিয়ন পরিষদ মার্কেট, আবাদ তাকিয়া মাদ্রাসা মোড় ও বন্দর চৌরাস্তা এলাকায় প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই বসে যায় এক ব্যতিক্রমী হাট। এখানে বিক্রি হয় না কোনো ধান, চাল কিংবা গবাদিপশু—এখানে বিক্রি হয় মানুষের শ্রম, ঘামের মূল্য আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম। স্থানীয়দের কাছে এটি “মানুষ হাট” কিংবা “শ্রম বিক্রির হাট” নামে পরিচিত। উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ প্রতিদিন কাজের আশায় এখানে এসে জড়ো হন। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন তারা। কারও চোখে ক্ষীণ আশার আলো, কারও চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ। অপেক্ষা শুধু একজন কাজদাতার—যিনি এসে বলবেন, “চলেন, আজ কাজ আছে।”এই হাটে আসা মানুষের হাতে থাকে তাদের জীবিকার অস্ত্র—কাস্তে, কোদাল, শাবল, হাতুড়ি কিংবা বাঁশের ডালি। কেউ রাজমিস্ত্রির সহকারী, কেউ দিনমজুর, কেউ কৃষিশ্রমিক। কাজ মিললে সন্ধ্যায় ঘরে হাঁড়ি চড়ে, আর কাজ না মিললে পুরো পরিবার ডুবে যায় নীরব হতাশায়। বুধবার (১৩ মে) সকালে বন্দর চৌরাস্তায় কথা হয় রাজমিস্ত্রি আব্দুর রশিদের সঙ্গে। মাথায় পুরনো গামছা, হাতে কাজের যন্ত্রপাতি। তিনি বলেন,

“অভাবের তাড়নায় মানুষ প্রতিদিন এখানে আসে। মালিকপক্ষ এখান থেকেই শ্রমিক নিয়ে যায়। এতে উভয়েরই সুবিধা হয়।”এদিকে আবাদ তাকিয়া মাদ্রাসা মোড়ে কৃষিশ্রমিকদের ভিড় আরও বেশি। কারণ এখন ইরি ধান কাটা ও ভুট্টা ভাঙানোর মৌসুম চলছে। মাঠে কাজের চাপ বাড়লেও শ্রমিকের সংখ্যার তুলনায় কাজ এখনও অপ্রতুল। সুন্দরপুর গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন,“ভোরে বের হই, সারা দিন বসে থাকি। কেউ ডাকলে কাজ পাই, না হলে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হয়।”বাচোর ইউনিয়নের সামশুল হক ও বাসিয়া রায় জানান, তারা প্রতিদিন শুধু কাজের আশায় এখানে বসে থাকেন। কাজ না পেলে হতাশ মনেই বাড়ি ফিরতে হয়।গুয়াগাঁও গ্রামের ভন্দু রায় বলেন,“দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পাই, সেটাও নিয়মিত না। এখন কাজের চেয়ে মানুষ বেশি।”
অভাব আর অনিশ্চয়তার এই জীবন থেকে মুক্তির আশায় উত্তরাঞ্চলের বহু মানুষ ঘর ছাড়ছেন। কেউ যাচ্ছেন বগুড়া, কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট কিংবা রাজধানী ঢাকায়। পরিবার-পরিজন রেখে দূর শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করাই হয়ে উঠেছে তাদের জীবনের বাস্তবতা।
ঢাকায় কর্মরত এক শ্রমিকের স্ত্রী আকলিমা বেগম বলেন,“এলাকায় কাজ নেই বলেই বাইরে যেতে হয়। না গেলে সংসার চালানো কঠিন।”
স্থানীয়দের মতে, উত্তরাঞ্চলে শিল্প-কারখানা ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। ফলে প্রতিদিন ভোরে শত শত মানুষ জীবিকার আশায় রাস্তায় বসে থাকেন, যেন তারা অপেক্ষমাণ কোনো নীরব মিছিল। এ বিষয়ে রাণীশংকৈল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আল্লামা ওয়াদুদ বিন নূর আলিফ বলেন,“কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো না গেলে এই বাস্তবতার পরিবর্তন হবে না।”রাণীশংকৈলের এই মানুষ হাট যেন বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রতিদিন সূর্য ওঠে আশায়, আর ডুবে যায় দীর্ঘশ্বাসে।
Leave a Reply