
হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
যে টাকার হিসাব মেলেনি, সেই টাকার ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল একটি প্রাণ। কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সময় লাঠির আঘাতে প্রাণ গেল নিরাপত্তাকর্মী মো. আব্দুর রহমানের (৫৮)। আর এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক নিরাপত্তাকর্মী জুয়েল (১৯)-এর বিরুদ্ধে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেলে ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন। পুলিশের দাবি, বেতনের টাকা নিয়ে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পনা করে আব্দুর রহমানকে লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করেন জুয়েল। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের মোবাইল ফোন, বাইসাইকেল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লাঠি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নে ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে হানিফ পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন নিটল টাটা সার্ভিসিং সেন্টারে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন আব্দুর রহমান। একই প্রতিষ্ঠানে এর আগে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন জুয়েল। সম্প্রতি জুয়েলের দায়িত্ব পালনকালে প্রতিষ্ঠানের একটি জানালার থাই গ্লাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দায়িত্বে অবহেলার কারণে সেটি মেরামতের জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জুয়েলের দুই মাসের বেতনের প্রায় ২৩ হাজার টাকা আব্দুর রহমানের কাছে দেয়। পরে জুয়েল থাই গ্লাস মেরামতে প্রায় ১১ হাজার টাকা ব্যয় করেন। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আরও কিছু কাজ করাতে চাইলে এবং টাকা ফেরত না দেওয়াকে কেন্দ্র করে আব্দুর রহমানের সঙ্গে জুয়েলের বাকবিতণ্ডা হয়।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জুয়েলের ধারণা হয়, আব্দুর রহমান তার বেতনের অবশিষ্ট টাকা ফেরত না দিয়ে নিজের উদ্যোগে অতিরিক্ত কাজ করাচ্ছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল জানিয়েছেন, ওই ক্ষোভ থেকেই তিনি আব্দুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।পুলিশের দাবি, ঘটনার দিন জুয়েল নিটল টাটা সার্ভিসিং সেন্টারের বাউন্ডারি দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। পরে আব্দুর রহমানের অজান্তে লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এদিকে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন আব্দুর রহমান। সকাল ১১টার দিকে স্ত্রীকে ফোন করে কথা বলেন তিনি। এরপর পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।দুপুর পৌনে ২টার দিকে আব্দুর রহমানের ছেলে বাবার জন্য খাবার নিয়ে কর্মস্থলে যান। সেখানে বাইরে থেকে গেট বন্ধ দেখতে পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাতের ডিউটিতে যোগ দিতে আসেন আরেক নিরাপত্তাকর্মী তোয়াবুর রহমান। তিনিও গেট তালাবদ্ধ দেখতে পান। বিষয়টি আব্দুর রহমানের ছেলেকে জানালে তোয়াবুর রহমান বাউন্ডারি দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে আব্দুর রহমানকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আব্দুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে। এরপর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। নিহতের পরিবারের সদস্য, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়। একপর্যায়ে একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক নিরাপত্তাকর্মী জুয়েলকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে শনাক্ত করে পুলিশ। তাকে গ্রেপ্তারে ঠাকুরগাঁও শহরের সেনুয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালানো হলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। পরে জুয়েলের বাবা আব্দুল খালেকের দেওয়া তথ্য ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর সদর উপজেলার গোয়ালপাড়া এলাকায় তার নানার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আব্দুর রহমানের ব্যবহৃত বাইসাইকেল, মোবাইল ফোন ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লাঠি উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, এর পেছনে আরও কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তার আসামির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাজাহান আলীসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply