
মোহাম্মদ মাসুদ
চট্টগ্রাম নগরীতে গণপরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রী হয়রানি, ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় এবং নির্ধারিত গন্তব্যের আগেই যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে অক্সিজেন–বায়েজিদ–শেরশাহ–২ নম্বর গেইট সড়কে অটোটেম্পু ও গণপরিবহনের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা—কে নির্ধারণ করেছে?, অর্ধেক পথে নামিয়ে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ, গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন,
আপত্তি জানালেই দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ, শ্রমজীবী মানুষের ওপর বাড়তি চাপ, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, ‘ভাড়া নৈরাজ্য’ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি ভুক্তভোগী যাত্রী সাধারনের।
১৪ আগস্ট ২৬ইং (শুক্রবারে) বিকেল বেলায় ভোগান্তির শিকার হয় ভুক্তভোগী যাত্রিরা। তার সপ্তাহ আগে থেকেই চলছে এমন অনিয়ম দুর্নীতি অসংগতি। তাছাড়া প্রতিনিয়ত প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নানা ইস্যুতে অর্ধেক পথে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে ভোগান্তি সৃষ্টি করে। সেবার বিপরীতে ডবল ভাড়া নেওয়া তাদের নিত্যনতুন অভ্যাস কৌশল রুটিনে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতিতে যাত্রীরা জিম্মি অসহায় নিরুপায় বাধ্য
ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫ টাকার নির্ধারিত ভাড়া ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। আবার যাত্রীদের অর্ধেক পথে নামিয়ে দিয়ে একই গন্তব্যে যেতে নতুন করে আরেকটি গাড়িতে উঠতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে একই যাত্রাপথে যাত্রীকে কার্যত দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অক্সিজেন থেকে ২ নম্বর গেটমুখী কয়েকটি টেম্পুতে ভাড়া আদায় নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বায়েজিদ থেকে শেরশাহ পর্যন্ত যে ভাড়া আগে ৫ টাকা ছিল বলে তারা দাবি করছেন, সেটি এখন ১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও চালক বা পরিবহনকর্মীরা নিজেদের ইচ্ছামতো যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা—কে নির্ধারণ করেছে? : যাত্রীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকারি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কি না এবং হয়ে থাকলে সেই ভাড়া নির্ধারণ করল কে?
একজন ভুক্তভোগী যাত্রী জানান, তিনি একজন চালককে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন—“১০ টাকা ভাড়া কবে থেকে?” জবাবে চালক নাকি বলেন, “আজকে থেকে।” কিন্তু ওই যাত্রীর দাবি, তিনি এর আগের কয়েকদিনও একই পথে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করেছেন।
ফলে সাধারণ যাত্রীদের প্রশ্ন, ভাড়া বৃদ্ধির কোনো বৈধ সিদ্ধান্ত বা সরকারি অনুমোদন থাকলে তা যাত্রীদের জানানো হচ্ছে না কেন? আর অনুমোদন না থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
অর্ধেক পথে নামিয়ে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ :
যাত্রীদের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো—কখনো কখনো অর্ধেক পথ যাওয়ার পর যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর একই গন্তব্যে যেতে অন্য গাড়িতে উঠতে বাধ্য হন যাত্রীরা। এতে একবারের পরিবর্তে দুইবার ভাড়া দিতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এটি যদি পরিকল্পিতভাবে করা হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু যাত্রী হয়রানি নয়; বরং পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও তদারকির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি কৌশল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন মালিক বা চালকের সংশ্লিষ্টতা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পেছনে কোনো সংগঠিত সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন : অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের অভিযোগও রয়েছে। যাত্রীদের ভাষ্য, নির্ধারিত আসনে স্বাভাবিকভাবে চারজন বসার মতো জায়গা থাকলেও অনেক সময় সেখানে ছয়জন পর্যন্ত বসানো হয়। একজন যাত্রী কম থাকলেও গাড়ি ছাড়তে অনীহা দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন যাত্রী।
একইভাবে যাত্রী ওঠানামার সময় বারবার অতিরিক্ত যাত্রী বসানোর কারণে ভেতরে চরম অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শ্রমজীবী নারী-পুরুষ, পোশাকশ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দীর্ঘ সময় এমন অবস্থায় যাতায়াত করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে।
আপত্তি জানালেই দুর্ব্যবহারের অভিযোগ : যাত্রীদের অভিযোগ, ভাড়া বা অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ার বিষয়ে কেউ আপত্তি জানালে কোনো কোনো চালক ও পরিবহনকর্মীর কাছ থেকে রূঢ় আচরণ, তিরস্কার ও অশালীন মন্তব্য শুনতে হয়। ফলে অনেক যাত্রী প্রতিবাদ না করে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—গণপরিবহন কি যাত্রীসেবার জন্য, নাকি যাত্রীদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছেমতো অর্থ আদায়ের জন্য?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ : এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট ও মন্তব্য দেখা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সেখানে অক্সিজেন, বায়েজিদ বোস্তামী, শেরশাহসহ নগরীর বিভিন্ন রুটে অটোটেম্পু ও গণপরিবহনে ভাড়া আদায় এবং যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেছেন অনেকে।
পোস্টগুলোর মন্তব্যে অনেকেই দাবি করেছেন, এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট রুটের সমস্যা নয়; নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রশ্ন—নিয়মিত অভিযান ও তদারকি থাকলে গণপরিবহনে এমন অনিয়ম কীভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে?
শ্রমজীবী মানুষের ওপর বাড়তি চাপ : অক্সিজেন–
বায়েজিদ–শেরশাহ এলাকার গণপরিবহনের প্রধান যাত্রীদের একটি বড় অংশ পোশাকশ্রমিক, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মী ও নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। তাদের জন্য প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যয় সামান্য বাড়লেও মাস শেষে তা বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, নিত্যদিনের প্রয়োজনেই তাদের গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলে প্রতিবাদ করেও বিকল্প না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে সেই ভাড়া দিতে হয়। এতে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, গণপরিবহনে ভাড়া নির্ধারণ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
তাদের প্রশ্ন, কোনো রুটে ভাড়া পরিবর্তন করা হলে তার অনুমোদন কোথায়? অনুমোদিত ভাড়া কত—তা গাড়িতে স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা হয় কি না? অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়? আর অর্ধেক পথে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো নিয়মিত মনিটরিং রয়েছে কি না?
‘ভাড়া নৈরাজ্য’ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি : ভুক্তভোগীরা বলছেন, এটি কোনো নতুন অভিযোগ নয়। দীর্ঘদিন ধরেই নগরীর বিভিন্ন রুটে ভাড়া নিয়ে অসঙ্গতি, যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ও চালক-স্টাফদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের তুলনায় দৃশ্যমান ও স্থায়ী প্রতিকার খুবই সীমিত।
তাই যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে মাঠপর্যায়ে তদন্ত, অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা যাচাই, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে অভিযান, গাড়ির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী পরিবহন এবং যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা ক্ষোভের মন্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশাসন বাস্তবতা যাচাই করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও ন্যায্য ভাড়ায় যাতায়াত নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন একটাই—অতিরিক্ত ভাড়া, অর্ধেক পথে যাত্রী নামিয়ে দেওয়া এবং গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহনের এই অভিযোগের অবসানে প্রশাসন কবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে?
উলেখ্য: তথ্য বিভ্রাট অসত্য প্রোপাপাকান্ড নয়। তথ্যমতে, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া এবং ঘটনাপ্রবাহে তথ্যভিত্তিক, ভারী ও অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই, যাচাই করে বাস্তবতায়বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য উপস্থাপন বৃহৎ জনস্বার্থে প্রকাশিত।
Leave a Reply