
হুমায়ুন কবির, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
প্রায় ৪০ বছর আগে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়া এক নারীর হঠাৎ ফিরে আসা যেন বাস্তবের মাটিতে লেখা এক সিনেমার গল্প। দীর্ঘ চার দশক পর ভারতের পাঞ্জাব থেকে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিজের জন্মভিটা ঠাকুরগাঁওয়ের শাহাপাড়া গ্রামে ফিরেছেন মোছা. জাহানারা। তার এই প্রত্যাবর্তনে পুরো এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে আবেগঘন এক মানবিক দৃশ্য, যেখানে আনন্দ আর অশ্রু মিলেমিশে একাকার।
রোববার (৩ মে) সকালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের শাহাপাড়া গ্রামে পা রাখতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জাহানারা। একে একে ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজি ও আত্মীয়স্বজনদের বুকে জড়িয়ে ধরেন তিনি। চার দশকের দীর্ঘ বিচ্ছেদের বেদনা যেন মুহূর্তেই গলে যায় ভালোবাসার অশ্রুধারায়।পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জাহানারা মৃত তমিজ উদ্দিনের মেয়ে। ছোটবেলায় হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। বহু খোঁজাখুঁজির পরও কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবার একসময় ধরে নেয়, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত খেলায়, সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটিই আবার ফিরে এলেন আপন ঠিকানায়। গত শনিবার (২ মে) গভীর রাতে ছেলেকে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছান জাহানারা। তাঁর ছেলে মানজিদার সিং (৩০)। প্রথমে তিনি জগন্নাথপুর ইউনিয়নের পীরবাড়ি গ্রামে বোনের বাড়িতে ওঠেন। পরদিন সকাল ১০টার দিকে নিজ গ্রাম শাহাপাড়ায় গেলে তাকে দেখতে ভিড় জমায় শত শত মানুষ। কেউ একনজর দেখতে, কেউ কথা বলতে, আবার কেউ হারানো দিনের গল্প শুনতে—পুরো গ্রাম যেন পরিণত হয় এক আবেগঘন মিলনমেলায়।জাহানারার ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“প্রায় ৪০ বছর আগে পাশের বাড়ির ফখদুল নামে এক ভাতিজা কৌশলে আমার বোনকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমরা তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। অনেক খুঁজেছি, কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। আজ মনে হচ্ছে আল্লাহ নিজেই তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।”এক প্রতিবেশী বলেন,“শৈশবের সেই মুখ আজও ভুলিনি। এত বছর পরও এক মুহূর্তে চিনে ফেলেছি। মনে হচ্ছে সময় যেন থমকে গেছে।”ভাতিজি সুমাইয়া আক্তার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন,“ছোটবেলা থেকে ফুপুকে নিয়ে গল্প শুনেছি। কখনো ভাবিনি সামনে দেখতে পাবো। আজ তাকে জড়িয়ে ধরে মনে হয়েছে, হারানো জীবনের একটা অংশ ফিরে পেয়েছি।”
প্রতিবেশী আবদুল করিম বলেন,
“আজ পুরো গ্রাম আনন্দে মেতেছে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা কষ্ট আছে—একজন মানুষ এত বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগে।”পরিবারের সদস্যরা জানান, ভারতে গিয়ে জাহানারা নতুন পরিচয়ে জীবন শুরু করেন। পাঞ্জাবের তাংতারা এলাকায় বিয়ে করে বর্তমানে চার সন্তানের জননী তিনি। তার সংসার এখন ভারতে হলেও, শিকড়ের টানেই তিনি ফিরে এসেছেন নিজের জন্মভিটায়।
জাহানারা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“আমি কখনো ভাবিনি আবার এই বাড়িতে ফিরতে পারব। আমার শৈশব, আমার পরিবার—সবকিছু আজ চোখের সামনে।”তার ছেলে মানজিদার সিং বলেন,“মায়ের মুখে সবসময় গ্রামের কথা শুনেছি। আজ সেই জায়গায় এসে আমি খুবই আবেগাপ্লুত।”পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেলে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখান থেকে আবার ভারতে ফিরে যাবেন। বিদায়ের কথা উঠতেই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। গ্রামের এক প্রবীণ বাসিন্দার ভাষায়,“এমন দৃশ্য জীবনে খুব কমই দেখা যায়। আজ আনন্দ আছে, আবার বিদায়ের বেদনাও আছে—এই মুহূর্ত যেন স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।” এক হারিয়ে যাওয়া জীবনের ফিরে আসা—যেখানে সময় হার মানে, আর ভালোবাসা জয়ী হয়।
Leave a Reply