
মোহাম্মদ মাসুদ :
চট্টগ্রাম: ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে, সেভ দ্য চিলড্রেন সহায়তায় ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা) ‘র বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যাসহ বহুমাত্রিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দুর্যোগের আগেই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে প্রস্তুতি ও আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর ‘স্কেলিংআপ মাল্টি হ্যাজার্ড এ্যান্টিসিপেটরি এ্যাকশন ইন হিলি রিজিওন অফ বাংলাদেশ ( সুরক্ষা) প্রজেক্টের কার্যক্রম চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সুলতান আহমদ হলে জেলা পর্যায়ের প্রকল্প অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুর রহমান খাঁন-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভাটি সঞ্চালনা করেন ইপসার প্রকল্প কর্মকর্তা মুহাম্মদ আতাউল হাকিম।
সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খাঁন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল সরোয়ার, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক রুমানা আক্তার, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান, জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি অফিসার ডা. মো. সাহাব উদ্দিন, মেট্রোপলিটন কৃষি অফিসার (ডবলমুরিং জোন) পারমিতা ঘোষ, ফিরোজশাহ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম এছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম ফিসারিজ কোয়ারেন্টাইন অফিসার বিজয় কুমার দাস, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর বিভাগীয় সমন্বয়কারী মনিরা পারভীন, সাংবাদিক এম কে মনিরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ইপসার আরবান রেজিলিয়েন্স ফোকাল সানজিদা আক্তার। প্রকল্পের সার্বিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, প্রধান কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর অরুণ দর্শী চাকমা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুর রহমান খাঁন বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী আবহাওয়া ও জলবায়ু তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পূর্বাভাস প্রদান করলেই হবে না, সেই তথ্য যথাসময়ে স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে তা মানুষের প্রস্তুতি ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। পূর্বাভাসকে কেন্দ্র করে যদি পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, তাহলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আবহাওয়া অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল সরোয়ার বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার দুর্যোগঝুঁকি শুধু প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্টি হয় না; ভূমি ব্যবহার, অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং নগর সম্প্রসারণের মতো বিষয়ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়। ঝুঁকির কারণগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করে পূর্বেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দুর্যোগ পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খাঁন বলেন, দ্রুত নগরায়নের ফলে চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে দুর্যোগঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একটি দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহ. পরিচালক রোমানা আহমেদ বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। পাহাড়, বন, জলাধার ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশ সংরক্ষণ করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রকৃতিনির্ভর সমাধানকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ রক্ষা শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি দুর্যোগঝুঁকি কমানোরও একটি কার্যকর উপায়।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি দুর্যোগের আগে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদ নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্বেচ্ছাসেবক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগাম পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেলে দুর্যোগের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিলের কার্যকর ব্যবহার এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মেট্রোপলিটন কৃষি অফিসার (ডবলমুরিং জোন) পারমিতা ঘোষ বলেন, দুর্যোগের প্রভাব মানুষের জীবিকার ওপরও পড়ে। অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, বন্যা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবহাওয়া ও কৃষি তথ্য যথাসময়ে কৃষক ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে তারা ঝুঁকি বিবেচনায় আগাম সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা ও আবহাওয়া তথ্যের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সভায় জানানো হয়, Anticipatory Action বা পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম পদক্ষেপ এমন একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার আগে পূর্বাভাস ও ঝুঁকির তথ্যের ভিত্তিতে পূর্বনির্ধারিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এর ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।
‘সুরক্ষা’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলে একাধিক দুর্যোগ মোকাবিলায় Anticipatory Action-এর পরিধি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা এবং দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় Multi-Hazard Anticipatory Action, Forecast-based Financing (FbF) এবং Disaster Risk Financing (DRF) সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে অভিন্ন ধারণা তৈরি করা হবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগঝুঁকি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা মূল্যায়নের পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ফার্ম স্কুল, মেট ক্লাব এবং HAM Radio systems আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে কৃষি ও আবহাওয়াভিত্তিক তথ্য, আগাম সতর্কবার্তা এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এছাড়া দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ বাড়াতে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কার এবং দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসে নেচার বেইজড সলিউশন বা প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা হবে। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রিগার, আগাম পদক্ষেপ, অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের দায়িত্ব নির্ধারণ করে টেকসই এ্যান্টিসিপেটরি এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হবে।
এক্ষেত্রে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিলের কার্যকর ব্যবহার এবং নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এমন ব্যবস্থা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে এ্যান্টিসিপেটরি এ্যাকশন, ফোরকাস্ট বেইজড ফাইনান্সিং এবং ডিজাস্টার রিস্ক ফাইনান্সিং -কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মূলধারায় আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। প্রকল্পের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, স্থানীয় মালিকানা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা হবে। জেলা পর্যায়ের এই অবহিতকরণ সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, এনজিও, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন, বেসরকারি খাত, বন বিভাগ এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিনিধিগণ
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, ‘সুরক্ষা’ প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগের পূর্বাভাস, আগাম সতর্কতা, প্রস্তুতি এবং পূর্বনির্ধারিত পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপ্রবণ জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও সম্পদ সুরক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা ও সহনশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
Leave a Reply