
হুমায়ুন কবির রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি:
গ্রামীণ জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভরসাস্থল—কমিউনিটি ক্লিনিক। অথচ সেই ক্লিনিকগুলোই এখন ওষুধ ও সেবার সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায়। উপজেলার ২৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকেই দীর্ঘদিন ধরে নেই প্রয়োজনীয় ওষুধ, মিলছে না পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীও। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে হতাশ হয়ে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক বছর ধরে ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। একসময় যেখানে ২২ ধরনের ওষুধ পাওয়া যেত, এখন সেখানে সীমাবদ্ধতা এসে ঠেকেছে শুধু ওরস্যালাইন ও অল্প কিছু সাধারণ ট্যাবলেটে। এতে করে সাধারণ রোগীরা যেমন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি পরিবার পরিকল্পনা সেবা ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি। গোগোর গ্রামের গৃহবধূ মালেকা খাতুন (২৯) ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন,“ক্লিনিকে গেলে ডাক্তার থাকে না, ওষুধও পাওয়া যায় না। শুধু ওরস্যালাইন আর আয়রন ট্যাবলেট দেয়। গর্ভনিরোধের সুখী ট্যাবলেট পর্যন্ত নেই। তাহলে এই ক্লিনিক দিয়ে আমাদের কী উপকার?”
একই চিত্র পাটগাঁও গ্রামের আসমা আক্তারের কথায়ও উঠে আসে। তিনি জানান, গ্রামের অনেক নারী এখনও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতন নন। তারা ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষেই কষ্টসাধ্য। কোচল কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার আপতারুল ইসলাম বলেন, “২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বরের পর থেকে কোনো ওষুধই পাইনি। প্রতিদিন রোগীরা এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে। তাছাড়া আমরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতাও পাচ্ছি না।” তিনি আরও জানান, গ্রেড পরিবর্তনজনিত অসন্তোষের কারণে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের মধ্যে আন্দোলনের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আল-হানিফ বলেন,“কেন্দ্র থেকে অনেকদিন ধরে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আমরা চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। সরবরাহ পেলেই দ্রুত বিতরণ করা হবে।”অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কালাম আহমেদ জানান, উপজেলার সবগুলো ক্লিনিকেই একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। জেলা পর্যায় থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিছুর রহমান বলেন, “জেলায় ১৪৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে থাকলেও এখন ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ট্রাস্টে যাওয়ার পর থেকেই নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে—ওষুধ সংকট, বেতন বকেয়া, জনবল ঘাটতি।”তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত এই সংকট নিরসন না হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়তে পারে। সমাজের সচেতন মহল বলেন স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ সেই সেবাই যখন হাতের নাগালে থেকেও অপ্রাপ্য হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। রাণীশংকৈলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর এই চিত্র শুধু একটি উপজেলার নয়—এটি গোটা গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যই এক গভীর সতর্কবার্তা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
Leave a Reply