
মোহাম্মদ মাসুদ
চট্টগ্রামে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস, লাখো মানুষের জনস্রোত। সকাল থেকেই লাখো মানুষের অংশগ্রহণে উজ্জীবিত জশনে জুলুস শুরু। জুলুসে ৫০ লাখের বেশি মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা আয়োজকদের দাবি দাবি।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরীজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫৫তম ঐতিহাসিক জশনে জুলুস। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি, বুধবার ২৬ আগস্ট সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন সড়ক পরিণত হয় বিপুল মানুষের জনস্রোতে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা জুলুসে অংশ নিতে নগরীতে সমবেত হন। আয়োজকদের প্রত্যাশা ছিল, এবারের জশনে জুলুসে ৫০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে।
আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় এবং গাউসিয়া কমিটির সহযোগিতায় আয়োজিত এ জশনে জুলুসের নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানের সিরিকোট দরবারের সাজ্জাদানশীন পীর আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ। তাঁর সঙ্গে বিশেষ অতিথি ও উপনেতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাহেবজাদা সৈয়দ মুহাম্মদ কাসেম শাহ এবং শাহজাদা সৈয়দ মুহাম্মদ আকিব শাহ।
সকাল থেকে নগরজুড়ে জনস্রোত :
ভোর থেকেই চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন প্রবেশপথে মানুষের ঢল নামে। বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত যানবাহনসহ বিভিন্ন পরিবহনে এবং অনেকে পায়ে হেঁটে ষোলশহর, মুরাদপুরসহ জুলুসের আশপাশের এলাকায় এসে সমবেত হন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরের প্রধান প্রধান সড়কে মানুষের উপস্থিতি আরও ঘন হয়ে ওঠে।
আয়োজকদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ৮টায় ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়া এলাকা থেকে জুলুসের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। নির্ধারিত পথ ধরে জুলুসটি মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, দামপাড়া, লালখান বাজার ও টাইগারপাসসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে ফিরে আসে।
১৯৭৪ থেকে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা :
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে আওলাদে রাসুল আল্লামা হাফেজ সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ (র.)-এর দিকনির্দেশনায় চট্টগ্রামে প্রথম জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর ১২ রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে এ আয়োজন ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। চলতি বছর আয়োজনটি ৫৫তম জশনে জুলুস হিসেবে অনুষ্ঠিত হলো।
চট্টগ্রামের এ আয়োজনকে আয়োজকরা দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমও এবারের জুলুসে বিপুল মানুষের উপস্থিতি ও নগরজুড়ে জনস্রোতের কথা জানিয়েছে। তবে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড়’ বা নির্দিষ্টভাবে ‘৫০ লাখ’ মানুষের উপস্থিতির বিষয়টি আয়োজকদের দাবি/প্রত্যাশা হিসেবে উল্লেখ করাই তথ্যগতভাবে সতর্ক অবস্থান।
ধর্মীয় আবহে নগরী :
জশনে জুলুসকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও ধর্মীয় পতাকায় সাজসজ্জা করা হয়। সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন সড়কে ধর্মীয় আবহ তৈরি হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে পতাকা, প্ল্যাকার্ড ও বিভিন্ন ধর্মীয় স্লোগান দেখা যায়।
জুলুসের মূল বার্তায় শান্তি, মানবতা, সম্প্রীতি, অহিংসা এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক :
এত বড় জনসমাবেশকে ঘিরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়। জুলুসের শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনায় আনজুমান ও গাউসিয়া কমিটির প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন বলে আয়োজক সূত্রে জানা গেছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে অস্থায়ী শৌচাগার, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়। বিপুল জনসমাগমের কারণে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে স্বাভাবিক যান চলাচলে সাময়িক প্রভাব পড়ে।
জোহরের নামাজ, মাহফিল ও আখেরি মোনাজাত:
জুলুস নির্ধারিত পথ পরিক্রমা শেষে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে ফিরে আসে। সেখানে জোহরের নামাজ, সংক্ষিপ্ত মাহফিল এবং দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি কামনায় আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
১২ রবিউল আউয়াল আনন্দ ও স্মরণের দিন:
বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১২ রবিউল আউয়াল বুধবার ২৬ আগস্ট পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে দিনটি সরকারি ছুটির দিন।
ইসলামি ঐতিহ্যের একটি প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছে। এ কারণে মুসলিম সমাজের বিভিন্ন অংশে দিনটি নবীজির জীবন, আদর্শ, মানবতা, শান্তি, ন্যায় ও নৈতিকতার শিক্ষা স্মরণের মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর ওফাতের স্মরণে অনেক মুসলমান গভীর শোক ও বেদনাও অনুভব করেন।
ঈদে মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানরা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী মিলাদ, দোয়া, আলোচনা, মাহফিল ও অন্যান্য কর্মসূচি পালন করেন। চট্টগ্রামের জশনে জুলুস সেই ধর্মীয় ঐতিহ্যেরই একটি বৃহৎ স্থানীয় আয়োজন, যা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
উল্লেখ্য : ঐতিহ্য, ধর্মীয় আবেগ ও লাখো মানুষের অংশগ্রহণে আবারও জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম। ৫৫তম জশনে জুলুস ঘিরে নগরীর রাজপথে যে বিশাল জনসমাগমের দৃশ্য তৈরি হয়েছে, তা চট্টগ্রামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
Leave a Reply