
সিডনি প্রতিনিধিঃ
সিডনি, অস্ট্রেলিয়া -গভীর শোক, শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সিডনিতে পালিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম শাহাদাত বার্ষিকী। ১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত এ স্মরণসভায় বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অস্ট্রেলিয়ার বিপ্লবী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জনাব গিয়াস উদ্দিন মোল্লার আহ্বান ও পরিচালনায় এবং বিশিষ্ট লেখক কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, ও ওয়েষ্টার্ণ সিডনি ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষক ড. কাইউম পারভেজের সভাপতিত্বে সিডনির লাকেম্বার ধানসিঁড়ি রেস্টুরেন্টে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও অতিথিরা কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে বঙ্গবন্ধু এবং ১৫ আগস্টে নিহত তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শোকাবহ পরিবেশে স্মরণ করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত এই মহানায়ককে।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ ও ক্যানবেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী কাজী। বিশেষ অতিথি ও বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. হাবিবুর রহমান, জনাব মুনীর হোসেন, মিসেস কবিতা পারভেজ, বিশিষ্ট আইনজীবী এ্যাডভোকেট আইভি রহমান, ড. তুষার দাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা এনায়েতুর রহিম বেলাল, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সফল সভাপতি ড. নিজাম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক জনাব আব্দুল জলিল, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. লাভলী রহমান এবং সাবেক সভাপতি ডা. নূর রহমান খোকন।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সাবেক সফল ভিপি ও বিশিষ্ট ছাত্রনেতা ইফতেখার উদ্দিন ইফতু, ঢাকার রাজপথের সাবেক ছাত্রনেতা এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক জনাব অপু সারোয়ার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম সরদার, আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার শেখ মো. হাদিউজ্জামান এবং কথাসাহিত্যিক জনাব আরিফুর রহমান।
অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধান শিক্ষক বাবু নন্দন বড়ুয়া, সাংবাদিক প্রদীপ শীল, ছাত্রনেতা ফাহিমসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা আবেগঘন বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, সংগ্রাম, ত্যাগ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
বক্তারা বলেন, ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে শুধু একটি শোকের দিন নয়; এটি এমন একটি বেদনাবিধূর অধ্যায়, যে দিন একটি জাতি তার মহান স্থপতিকে হারিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা করা হয়নি, আঘাত করা হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং একটি জাতির স্বপ্নের উপর।
বক্তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির অধিকার ও মুক্তির সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবরণ, ত্যাগ ও নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে বাঙালি স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল। তাই তাঁর স্মৃতি কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের ইতিহাস ও অস্তিত্বের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
বক্তারা ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও পরবর্তী সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ওই সময় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বহু নেতা-কর্মী নিহত, আহত, গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে এবং অনেকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বক্তারা মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু প্রতিহিংসা, সহিংসতা ও নিপীড়নের মাধ্যমে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব নয়।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশকে আবারও গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক মর্যাদা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পথে ফিরিয়ে নিতে দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রকামী সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
স্মরণসভায় বক্তারা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হলেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করা যায়নি কোনদিন যাবেও না। তাঁর শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও বাঙালির হৃদয়ে তাঁর আদর্শ ও স্মৃতি অমর হয়ে রয়েছে।
তাঁরা বলেন, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন লাল-সবুজের পতাকা উড়বে, ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করা আজকের প্রজন্মের অন্যতম দায়িত্ব।
বক্তারা ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক ১৫ আগস্টের অঙ্গীকার।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং ১৫ আগস্টে নিহত সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। শোকাবহ পরিবেশে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন পল মধু।
Leave a Reply